জানলার পাশে বসে দিন কাটে অনেক বয়স্কের। দেখাশোনা দূর, দেখভালের কেউ থাকে না। দুটো কথা বলার জন্য মন আঁকুপাঁকু করে। সেই সমস্যা দূর করতে এক ধরনের সংস্থা এখন এগিয়ে আসছে। প্রাক্তন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যও এই পরিষেবা নিচ্ছেন।
তমালিকা দে, শিলিগুড়ি: কথায় আছে বার্ধক্যে বারাণসী। বিশেষ করে যাঁর কেউ নেই। বয়স বাড়লে দেখবে কে? তার ওপর আছে একাকিত্ব। শারীরিক, মানসিক। অঢেল টাকা থাকলেও যে সমস্যার সমাধান কঠিন। শুধু যাঁর কেউ নেই নয়, যাঁদের স্বজন দূরে থাকেন, নিঃসঙ্গতা তাঁদের ঘিরে ধরে। হঠাৎ অসুস্থ হলে যেমন চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কেউ থাকে না, তেমনই দুটো কথা বলে একাকিত্বের যন্ত্রণা লাঘব করার উপায় থাকে না।
বিদেশে তো বটেই, দেশের বিভিন্ন শহরে, এমনকি কলকাতায় একাকী বৃদ্ধদের এই সমস্যা সমাধানের ভার নিতে বিভিন্ন সংস্থা তৈরি হয়েছে। বার্ধক্যে সঙ্গ দিতে এমন পরিষেবা এখন হাজির শিলিগুড়িতেও (Siliguri)। প্রবীণ সিপিএম নেতা তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য (Ashok Bhattacharya) এই পরিষেবা নিতে শুরু করেছেন। আত্মীয়স্বজন থাকলেও স্ত্রী-বিয়োগের পর বাড়িতে তিনি একেবারে একা থাকেন।
সম্প্রতি ঘরে চেয়ারে বসে কাজ করতে করতে পড়ে গিয়েছিলেন। কপাল ফেটে রক্তারক্তি হয়েছিল। কোনওরকমে এক আত্মীয়কে ডাকতে পেরেছিলেন। যেকারণে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা হয় তাঁর। বুকে পেসমেকার বসে। একা বাড়িতে শারীরিক অবস্থার ফের অবনতি হলে কী পরিস্থিতি হবে ভেবে ২৪ ঘণ্টা দেখভালের জন্য এরকম একটি সংস্থার পরিষেবা নিচ্ছেন তিনি। গত ১৫ দিন তাঁর সঙ্গে সবসময় ওই সংস্থার একজন সার্ভিস বয় থাকছেন।
প্রবীণ নেতার কথায়, ‘অনেকসময় খবরে দেখি ফ্ল্যাটে তিন-চারদিন মরে পড়ে রয়েছেন কেউ। যাঁর খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। আমার পরিবারের অন্য সদস্যরা আমার পাশে রয়েছেন ঠিকই। কিন্তু যাতে যে কোনও প্রয়োজনে কোনও অসুবিধা না হয়, সেজন্য এই সার্ভিস নিয়েছি।’ তাঁর মতে, ‘সমাজ ব্যবস্থা বদলের এটা উদাহরণ। যে প্রবীণদের সন্তানরা কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন বা বাড়িতে দেখভাল করার সেভাবে কেউ থাকেন না, তাঁদের ২৪ ঘণ্টা আপৎকালীন স্বাস্থ্য পরিষেবা, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, ওষুধ এনে দেওয়া এবং প্রতিদিনের ছোটখাটো প্রয়োজনে পাশে থাকার কাজ করে থাকেন এই সংস্থার সার্ভিস বয়রা।’
মন্ত্রী কিংবা মেয়র থাকাকালীন তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য বাড়িতে ভিড় লেগে থাকত। অনেক সময় আগাম অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে যেতে হত। তাঁর এক ডাকে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হত। সেই তিনি এখন একা। বার্ধক্যের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে শারীরিক অসুস্থতা ও নিঃসঙ্গতায় পাশে থাকার জন্য পেশাদার সংস্থার সাহায্য নিতে হয়েছে তাঁকে।
জীবনের দীর্ঘ সময় রাজনীতিতে কাটিয়েছেন। সিপিএমের দলীয় নিয়ম মেনে সব পদ ছেড়ে এখন অবসরে কাটাচ্ছেন। যদিও গত বিধানসভা ভোটে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গিয়েছে তাঁকে। এখন কলেজপাড়ার একটি সংস্থার পরিষেবা পাওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন অশোক।
কয়েক বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন তাঁর স্ত্রী রত্না ভট্টাচার্য। সেই ধাক্কা সামলে ওঠার সময়েও দল থেকেও সরে যেতে হয়েছিল দায়িত্ব থেকে। দিনের বেশিরভাগ সময় বাড়িতে পড়াশোনা ও লেখালেখি করে সময় কাটে। বার্ধক্যে একাকী ও নিঃসঙ্গতায় কতটা অসহায় হয়ে পড়েন একজন মানুষ, অশোক তার উদাহরণ। তবে বিষয়টি উপলব্ধি করে এই পরিষেবা গ্রহণ করছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় এধরনের সার্ভিস স্টাফদের প্রয়োজন আরও বাড়বে।’ বয়সকালে যত জনসংযোগই থাক, বার্ধক্যে অন্য নিঃসঙ্গদের ভবিতব্যও যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন প্রাক্তন প্রভাবশালী মন্ত্রী।

