সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, কানসাস সিটি: বিশ্বকাপ ফাইনাল জেতা তাঁদের পক্ষে সম্ভব, লামিনে ইয়ামালের (Lamine Yamal) এই আত্মবিশ্বাসী মন্তব্যের সঙ্গে একমত স্বয়ং লিওনেল স্কালোনি। সদ্য ইউরো কাপ জিতেছেন, যাকে বিশেষজ্ঞরা আজকাল বিশ্বকাপের চেয়েও কঠিন বলছেন। আর এবারের বিশ্বকাপে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে গোল করে রেকর্ড বইয়েও নাম তুলেছেন ইয়ামাল। ১৯৫৮ সালে পেলের পর বিশ্বকাপে এত কম বয়সে গোল করার রেকর্ড এখন শুধুই তাঁর। তবে মাঠের এই সাফল্যের বাইরেও তাঁর একটা অন্য গল্প আছে, যা সাধারণ মানুষের মন ছুঁয়ে যাবে। সম্প্রতি তিনি তাঁর মায়ের জন্য স্পেনের প্রাক্তন তারকা জুটি-পিকে এবং শাকিরার পুরোনো বিলাসবহুল বাড়িটি কিনেছেন।
স্পেনের মাতারো শহরের শ্রমিক এলাকা রোকোফন্ডায় তাঁর বেড়ে ওঠা। বার্সেলোনা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের সেই মহল্লায় ইয়ামালের বয়স যখন মাত্র তিন, তখন তাঁর বাবা মৌনির নাসারৌ ও মা সেইলা ইবানার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। সেইলা পরিচারিকার কাজ করতেন। ছেলেকে মানুষ করার জন্য দিনরাত এক করে খাটতে হত তাঁকে। ইয়ামাল এক পডকাস্টে স্মৃতিচারণ করেছিলেন, ‘আমি স্কুলে যেতাম, ফিরে এসে ট্রেনিং করতে যেতাম। অনেক রাতে মা ফিরত। কিন্তু এত ক্লান্তির পরেও মা ঠিক আমার জন্য নিজের হাতে ডিনার বানিয়ে রাখত।’ সেই অভাবের দিনগুলোতেই ইয়ামাল স্বপ্ন দেখেছিলেন, একদিন মাকে একটা বিশাল বাড়িতে আরামে রাখবেন।
সেই স্বপ্ন আজ সত্যি। বার্সেলোনার ঠিক বাইরেই সিউতাত ডায়াগোনাল নামে এক অত্যন্ত অভিজাত এলাকায় বিশাল এক এস্টেট কিনেছেন ইয়ামাল। কাকতালীয়ভাবে, এটিই ছিল ফুটবলার পিকে এবং পপ তারকা শাকিরার প্রাক্তন বাসভবন, যেখানে তাঁরা প্রায় এক যুগ কাটিয়েছেন। দুই হাজার বর্গমিটারেরও বেশি আয়তনের এই এস্টেটে রয়েছে তিনটি তলা জুড়ে ৬-৭টি বেডরুম, দুইটি সুইমিং পুল, হোম সিনেমা, নিজস্ব লাইব্রেরি এবং ওয়াইন সেলার। শাকিরার ফেলে যাওয়া রেকর্ডিং স্টুডিওটিও সেখানে একইরকম রয়েছে। নিজেকে ফিট রাখতে ইয়ামাল সেখানে একটি মিনি ফুটবল পিচ, প্যাডেল কোর্ট এবং জিম তৈরি করেছেন। মাকে নিজের ‘রানি’ বলে ডাকেন ইয়ামাল। তাঁর কথায়, ‘মায়ের সব পাওয়া উচিত। আমি বলেছিলাম মা যে বাড়িটা পছন্দ করবে, সেটাই কিনে দেব।’ ওই বাড়িতে এখন মায়ের সঙ্গেই থাকে ইয়ামালের ছোট্ট সৎ ভাই কেইন।
শুধু মা নন, পরিবারের সবার কথাই ভেবেছেন এই তরুণ। বাবাকে বার্সেলোনা শহরের ভেতরেই একটি সুন্দর বাড়ি কিনে দিয়েছেন। আর যে রোকোফন্ডার ধুলো মেখে তিনি বড় হয়েছেন, সেখানকার পিন কোড ‘৩০৪’ আজও তিনি গোল করার পর হাতের ইশারায় বিশ্বকে দেখান। সেই রোকোফন্ডাতেই তিনি ঠাকুমার জন্য কিনে দিয়েছেন একটি বাড়ি।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে এই বিপুল টাকার উৎস কী? বার্সেলোনার সঙ্গে তাঁর নতুন চুক্তি। ২০৩১ সাল পর্যন্ত সই হওয়া এই চুক্তিতে ইয়ামালের রিলিজ ক্লজ রাখা হয়েছে ১০০ কোটি ইউরো। পারফরমেন্স বোনাস মিলিয়ে তাঁর বছরে আয় হতে পারে প্রায় ৪ কোটি ইউরো। পাশাপাশি অ্যাডিডাস, ভিসা, অপ্পো-র মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে কোটি কোটি টাকার চুক্তি তাঁকে আর্থিকভাবে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
তবে তাঁর এই সাফল্যের রাস্তাটা মোটেও মসৃণ ছিল না। বাবা মরোক্কান এবং মা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির হলেও ইয়ামাল স্পেনের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন। এর জন্য তাঁকে মরক্কোর সরকার এবং কোচের প্রবল চাপ সহ্য করতে হয়েছে। স্পেনে বসবাসকারী মরক্কানদের বর্ণবিদ্বেষী আক্রমণেরও শিকার হতে হয়েছে তাঁকে। এমনকি তাঁর বাবাকে একবার এক পার্কে ছুরিও মারা হয়েছিল, যার কারণ আজও জানা যায়নি। কিন্তু এতসব বিতর্ক আর অভাবের অন্ধকার পেরিয়ে ইয়ামাল আজ ফুটবলের এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি নিজের পরিশ্রমে মায়ের সব স্বপ্ন সত্যি করে দেখিয়েছেন।

