হিলি: ভিন রাজ্যে কাজে গিয়ে নিখোঁজ বহু বছর। ছেলের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরেছেন মা৷ শেষে হাল ছেড়ে মামলা থামিয়েছে আদালতও। সব আলো যখন নিভে এসেছিল তখনই সন্ধান মিলল যুবকের। বিহারে নিখোঁজ মানসিক ভারসাম্যহীন যুবকের খোঁজ মিলল মহারাষ্ট্রে। প্রতিবেশীর সহায়তায় ৫ বছর বাদে নিখোঁজ যুবককে উদ্ধার করল হিলি থানার পুলিশ।
হিলি থানার উজাল গ্রামের হতদরিদ্র ঝন্টু দাস৷ ২০২০ সালে পরিবার নিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজে গিয়েছিলেন বিহারের মুজাফরপুরে। সেখানেই ২০২০ সালের ১৫ অক্টোবর ঝন্টু দাসের বড় ছেলে সুজিত দাস(২৮)কে ঠিকাদার বীরেন্দ্র কুমারের বাড়িতে কাজের জন্য নিয়ে যান। তারপরে থেকে নিখোঁজ হয়ে যায় সুজিত। সুজিতের খোঁজ শুরু করে পরিবারের লোকজন। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর মুজাফরপুর থানায় সুজিতের পরিবার নিখোঁজ ডায়েরি করতে যান। সেখানকার পুলিশ সেই ডায়েরি না নিয়ে হিলি থানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তখন হিলি থানার পুলিশও নিখোঁজ ডায়েরি নিতে অস্বীকার করে।
নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার মাসখানেক বাদে আইনজীবীর সাহায্যে বিহারের মুজাফরপুর থানা ও হিলি থানায় চিঠি পাঠান সুজিতের মা। তারপরে বালুরঘাট কোর্টে সিআরপিসির ১৫৬(৩) ধারায় মামলা করা হয়৷ ওই মামলায় মুজাফরপুর থানায় মামলা দায়ের হয়। তারপরেও ঘটনার তদন্ত এগোয় নি। ২০২৩ সালে পাটনা হাইকোর্টে হেভিয়াস কর্পাস দায়ের করে সুজিতের পরিবার। ঘটনায় পটনা হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট পুলিশকে ভর্ৎসনা করে তদন্তকারী অফিসারকে বরখাস্ত করার নির্দেশ দেয়। তারপরেই ঘটনার তদন্তে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সুজিতে বাড়িতে এবং হিলি থানায় আসে মুজাফরপুর থানার পুলিশ৷ সুজিত দাসের সন্ধানে ৩ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে মুজাফরপুর পুলিশ৷ এদিকে হিলি থানার মামলায় যুক্ত স্থানীয় ঠিকাদার রথীন মহন্ত মারা যেতেই বালুরঘাট কোর্টে ওই মামলা থমকে যায়।
সম্প্রতি হিলি থানার দক্ষিণপাড়া এলাকার দুই যুবক মহারাষ্ট্রের পুনের হিনজাওয়াড়ি থানায় লোধা কনস্ট্রাকশনের কাজে গিয়ে সুজিতকে দেখতে পায়৷ সেখানে সুজিতের পরিচয় নিশ্চিত হতেই ওই দুই যুবক পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সুজিতের পরিবার তরফে ভিডিও কলে চিহ্নিত করা হয়৷ তারপরেই হিলি থানায় দ্বারস্থ হয় সুজিতের পরিবার৷ শুক্রবার দুপুরে হিলি থানার পুলিশ পুরোনো ফাইল খুলে মামলার রিওপেনের জন্য বালুরঘাট আদালতের দ্বারস্থ হয়৷ পুলিশ কথা শুনে আদালত সোমবার শুনানি দিন ধার্য করে। পুলিশও কালবিলম্ব না করে সুজিতের পরিবারকে দিয়ে নতুন মামলা দায়ের করিয়ে নিয়ে তদন্ত শুরু করে। শনিবারই মহারাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা হয় হিলি থানার দুই সদস্যের প্রতিনিধি দল। রবিবার দুপুরে হিনজাওয়াড়ি পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে লোধা কনস্ট্রাকশনে হানা দিয়ে সুজিত দাসকে উদ্ধার করে হিলি থানার এএসআই নিউটন সরকার ও কনস্টেবল মানস বিশ্বাস।
গত পাঁচ বছর ধরে সুজিত দাসকে কোথায় রাখা হয়েছিল? কীভাবে তাকে পরিচালনা করা হত? বিহারে নিখোঁজ হয়ে মহারাষ্ট্রে গিয়ে কীভাবে পৌঁছাল সুজিত? ঠিকাদারের ভূমিকা কী ছিল? সবদিক খতিয়ে দেখছে হিলি থানার পুলিশ।
এপ্রসঙ্গে সুজিতের বাবা ঝন্টু দাস বলেন, “স্থানীয় দুই যুবক কাজে গিয়ে ছেলেকে চিনতে পারে। তারপরে আমাদের জানায়। আমরা ওর সঙ্গে কথা বলে হিলি থানার পুলিশের কাছে যাই। পুলিশের সহযোগিতার সুজিত উদ্ধার হয়েছে। আমি ৫ বছর পরে ছেলেকে ফিরে পেয়েছি। এর থেকে বড় আনন্দের আমার কাছে কিছু নেই। সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।”
এপ্রসঙ্গে হিলি থানার আইসি শীর্ষেন্দু দাস বলেন, “৫ বছর ধরে সুজিত নিখোঁজ ছিল। স্থানীয় দুই যুবক মহারাষ্ট্রে কাজে গিয়ে সুজিতকে দেখে চিনতে পারে। তারপরে ওর পরিবার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আমরা কালবিলম্ব না করে মামলা দায়ের হতেই তদন্ত শুরু করি। ছেলেটিকে উদ্ধার করতে দ্রত মহারাষ্ট্রে টিম পাঠাই। ওরা সফলতার সঙ্গে আজ সুজিতকে উদ্ধার করেছে। ওখানে তদন্ত চলছে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুজিতকে ফিরিয়ে এনে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।”
