সৌরভ রায়, কুশমণ্ডি: কালিয়াগঞ্জ থেকে ফতেপুর হয়ে ইটাহারের দিকে যেতে গেলে রাস্তার ধারে মহিষবাথান গ্রামীণ হস্তশিল্প সমবায় সমিতির বিরাট ইমারত চোখে পড়বেই। সেখানে একসময় কাজ করতেন ৫০ জনের বেশি হস্তশিল্পী। আর এখন ভেতরে ঢুকলে মিউজিয়ামে কোনও মুখোশ চোখে পড়বে না।
কুশমণ্ডিকে (Kushmandi) বলা হয় লোকসংস্কৃতি ও লোকশিল্পের আকর ভূমি। বর্ষাকাল ছাড়া বছরের বাকি নয় মাস কুশমণ্ডি ব্লকের গ্রাম আলো করে রাখে গমীরা নাচ। মহিষবাথানের মুখোশ পেয়েছে ভারত সরকারের জিআই নম্বর। মুখার কদর বেড়েছে বিদেশের নানা শহরে। কিন্তু সেই মুখোশ শিল্পের বিকাশের কথা ভাবলে দেখবেন, রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিশ্রুতির মুখোশটা কখন যেন খসে পড়েছে।
বিধায়ক হোক বা মন্ত্রী- দল ভিন্ন হলেও কথায় আর কাজে ফারাকটা সেই একই। বাধ্য হয়ে শিল্পীরা মুখোশ তৈরি ছেড়ে বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পেশা। লোকপ্রসার প্রকল্প বন্ধ থাকায় নতুন মুখোশ নৃত্যশিল্পীর অভাব গমীরা দলে। মুখার বেলা এমন কেন হল?
মুখোশ তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন শংকর দাস। লন্ডন ফেরত শিল্পী হতাশা গোপন করতে পারলেন না, ‘সমবায়ের কোনও শিল্পী মুখোশ তৈরি করছে না। করবে কী করে? পুঁজিই নেই সমবায়ের।’
ওই সমবায়ের কর্ণধার পরেশ সরকার সিপিএম ছেড়ে তৃণমূলে এসেছিলেন। ভেবেছিলেন, মুখোশ শিল্প ও শিল্পীদের বিকাশ হবে। এখন গলায় কেবল আক্ষেপ। পরেশ বলছিলেন, ‘আমার ভাবনা ভুল ছিল। সব নেতাকে আমার চেনা হয়ে গিয়েছে।’
‘খালি মুখোশশিল্পের কথা শুনলেই হবে? আমাদের লোকসংস্কৃতির শিল্পীদের কথা শুনবেন না?’ আলোচনার মাঝে ঢুকে পড়েন সত্তর পেরিয়ে যাওয়া খন পালাগানের প্রথম মহিলা শিল্পী আকুলবালা সরকার। এই রাজ্য সরকারই তাঁকে পঞ্চানন বর্মা পুরস্কার দিয়েছে। খাগাইল টঙ্কনাথ হাইস্কুলের পাশে বিবর্ণ একটি ভবন দেখিয়ে বললেন, ‘এটা আমাদের লোকসংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র। বাম আমলে তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল। এরপর ২৪ বছর কেটে গেল। কাজ শেষ করার জন্য কেউ টাকা বরাদ্দ করেনি। জানেন, আমাদের কোনও মঞ্চ নেই?’
বসন্তের শেষ এই সময়টায় যেমন গরম পড়ার কথা, গত কয়েকদিনের বৃষ্টি আর মেঘলা আকাশের দরুন, তাপমাত্রা ততটাও চড়েনি। এসবের মধ্যে ভোটের উত্তাপ যতটা না চড়েছে, তার থেকেও বেশি চড়েছে এসআইআর-এর তাপ। কুশমণ্ডি ও গঙ্গারামপুর ব্লকের ১১টা গ্রাম পঞ্চায়েত মিলে এই কুশমণ্ডি বিধানসভা। এই বিধানসভা কেন্দ্রে ইতিমধ্যে ছয়শো নাম বাদ পড়েছে। এখন পর্যন্ত ১৯ হাজার ভোটারের ভাগ্য ঝুলে আছে বিচারাধীন হিসেবে। নির্বাচন কমিশন বলছে, ট্রাইবিউনালের দরজা খোলা। গ্রামগুলোতে কান পাতলে ভোটের আলোচনার চেয়ে এখন ভোট হারানোর আলোচনা বেশি। আর এসবকিছু যে শাসকদলের উৎকণ্ঠা বাড়িয়েছে, সেকথা বলাই বাহুল্য।
দুই সপ্তাহ আগে ঘূর্ণিঝড়ে বহু মানুষের বাড়ির চাল উড়ে গিয়েছে। গম, ভুট্টা, আর লংকা যাঁরা চাষ করেছিলেন, সেই কৃষকদের ক্ষত এখনও শুকোয়নি। বেতাহার গ্রামের মানিকুল বলছিলেন, ‘দুর্যোগে দুই বিঘা জমির গম নষ্ট হয়েছে। শস্যবিমার ক্ষতিপূরণ পাইনি। তারপর মঙ্গলবার শুনলাম আমাদের চার ভাইয়ের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ চলে গেল।’ কথা শেষ করতে পারেন না, ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলেন মানিকুল। পিঠ চাপড়ে সান্ত্বনা দেন প্রতিবেশী মাহাতাব।
কুশমণ্ডি বিধানসভার পূর্বদিকে পুনর্ভবা আর পশ্চিমে মরা শ্রীমতী নদী। মাঝে মৃতপ্রায় নোনাখারি, মান নদী, তুলাই নদী, বালিয়াখারি আর টাঙন নদী। নদীমাতৃক কুশমণ্ডির এখন জলের খোঁজে চাতকের দশা। টাঙন নদী নাকি কুশমণ্ডির লাইফলাইন! সেই নদীর দুই পাড়ে হাজার হাজার একর জমিতে সেচ দপ্তরের পাইপলাইন পাতা আছে। নদীতে জল থাকে না বলে মানুষ নিজের টাকায় সাবমার্সিবল পাম্প বসিয়ে কৃষিকাজ করেন। তা বলে কি টাঙন কিছুই দেয় না? দেয় তো। সেই নদীর ১২টি ঘাট থেকে কয়েকশো ট্র্যাক্টরে চাপিয়ে বালি পাচার চলছেই। সেই চোরাই বালি দিয়ে ঘর বানিয়ে বাংলার বাড়ি প্রকল্পে এগিয়ে কুশমণ্ডি। জেলা প্রশাসনের প্রশংসায় আধিকারিকের মুখ যত উজ্জ্বল হয়েছে, তত বুক খালি হয়েছে টাঙনের।
এখানে তো বিধায়ক রেখা রায়কে দ্বিতীয়বার টিকিট দিয়েছে তৃণমূল (TMC)। গত পাঁচ বছরে দলের ভেতরে কোন্দলের সব কাঁটা তুলতে পারেননি রেখা। তৃণমূলের এক সময়কার জেলা স্তরের নেতা, বর্তমানে পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য রীতেশ জোয়ারদারই তো বলছিলেন, ‘আমাকে দল কোনও দায়িত্ব দেয়নি।’ একাধিক তৃণমূল নেতা বসে গিয়েছেন। মিটিংয়ে ডাক পান না অনেকে। রেখার বাড়ি যেখানে, সেই দেউল পঞ্চায়েত ও লাগোয়া আকচা পঞ্চায়েত বিজেপির দখলে। বাকি পঞ্চায়েতগুলিতেও বিজেপি প্রভাব বিস্তার করছে। এসআইআর থেকে নাম বাদ যাওয়ার সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বলতে পারার উপায় নেই। এত কাঁটা সরিয়ে, উন্নয়নের পাঁচালি শুনিয়ে ভোটারদের মন কতটা জয় করবেন রেখা? দুশ্চিন্তায় তৃণমূলের নীচুতলার কর্মীরাও। গত বিধানসভা নির্বাচনে দশ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন রেখা। সম পরিমাণ ভোট বাদ চলে যাওয়ার আশঙ্কা মনে করিয়ে দিচ্ছেন তৃণমূলের কর্মীরাই।
এদিকে, দুইবারের প্রার্থী রঞ্জিত রায়কে সরিয়ে বিজেপি (BJP) এবার তাপস রায়কে প্রার্থী করেছে। সেই তাপসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন বিজেপির জেলা সম্পাদক অলোক চৌহান। দুই ফুলের এই একটা বিষয়ে খুব মিল, গোষ্ঠীকোন্দল। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জেরবার তাপস। বিক্ষুব্ধ বিজেপিরা আবার নির্দল প্রার্থী দেওয়ার জন্য তৈরি। দলের ভেতরে দ্বন্দ্ব এবং বাইরে এসআইআর নিয়ে তৃণমূলের কড়া প্রচার- এসব কাঁটা সরিয়ে কত বড় পদ্ম বাগান বানাবেন তাপস?
২০১৬ সাল পর্যন্ত এই কেন্দ্র ছিল আরএসপি’র দখলে। বিধায়ক নর্মদা রায়ের প্রভাব ছিল ব্যাপক। এবার তাঁর ছেলে জ্যোতির্ময় রায় প্রার্থী। এখন কুশমণ্ডিতে বামেদের সমর্থকরা টিমটিম করছেন। ভক্তিপুর গ্রামের ফাইনাল বর্মনের সংশয়াকুল প্রশ্ন, ‘তৃণমূল-বিজেপির লড়াই হবে। এমএলএ’র ব্যাটা লড়াই করতে পারবে ওদের সঙ্গে?’ কুশমণ্ডি বিধানসভার মধ্যে পড়ে গঙ্গারামপুর ব্লকের খানিকটা। জাহাঙ্গিরপুর, সুকদেবপুর ও বেলবাড়ি- তিনটে পঞ্চায়েতের ধার ঘেঁষে বয়ে গিয়েছে পুনর্ভবা। লাল থেকে নীল-সাদা, কোন আমলে রাজনৈতিক সংঘর্ষে কত রক্ত ঝরেছে এলাকায়, মনে রেখেছে সেই পুনর্ভবা। বহুদিনের স্মৃতি ও বঞ্চনার ক্ষোভ ধুয়ে ফেলবে, বহতা জলের আর তত ক্ষমতা কোথায়?
