নীতেশ বর্মন, শিলিগুড়ি : মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (কেএলও) প্রধান জীবন সিংহের চিকিৎসা শুরু হল পুরোদমে। গুয়াহাটিতে থাকা কেএলও প্রধানের শারীরিক পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একজন বিশিষ্ট চিকিৎসককে (এমডি)। অসমের এক শীর্ষস্তরের পুলিশকর্তার তত্ত্বাবধানে তিনি রয়েছেন। যদিও জীবন নিজেই জানিয়েছেন, তাঁর শরীরে বড় কোনও রোগের আশঙ্কা নেই। চিকিৎসকও রিপোর্টে বড় কোনও ব্যাধির কথা উল্লেখ করেননি।
জটিল শারীরিক অসুখ না থাকলেও চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চার দেওয়ালের মাঝে একপ্রকার বন্দি থাকায়, মানসিক অবসাদ গ্রাস করেছে তাঁকে। শরীরে কার্যত থাবা বসিয়েছে বার্ধক্য। শরীর অসমের গুয়াহাটিতে থাকলেও, তাঁর মন পড়ে রয়েছে আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রামের পৈতৃক ভিটেয়। জীবনের সায়াহ্নে এসে ছেলেবেলার হাজার স্মৃতি এবং ভিটেমাটির টান তাঁকে ব্যাকুল করে তুলছে। আবেগাপ্লুত জীবন বলেন, ‘বাড়ি যাবার কার মন না চায় ক তো। বয়স হইলে নিজের ভিটামাটির কথা কত মনত পরে। দুইটা বেটি আছে মোর।’ (বাড়ি ফিরতে কার না মন চায় বলো? বয়স হলে নিজের ভিটেমাটির কথা কত মনে পড়ে। আমার দুটো মেয়ে আছে)। তিনি জানান, দুই মেয়ে মাঝে মাঝে গুয়াহাটিতে তাঁর সঙ্গে দেখা করে যায়। তাঁর বোনেরাও দুই-একদিন করে কাটিয়ে যান। কিন্তু নিজের ভিটেয় ফেরার টান অন্যরকম।
নয়ের দশকের শুরুতে উত্তরবঙ্গের রাজবংশী ও ভূমিপুত্রদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, ভাষার স্বীকৃতি এবং পৃথক কামতাপুর রাজ্য গঠনের দাবি নিয়ে কেএলও গঠন করেছিলেন জীবন। প্রায় তিন দশক ধরে নেপাল, ভুটান ও মায়ানমারের সীমান্ত ঘেঁষা জঙ্গল থেকে চালিয়েছেন সশস্ত্র আন্দোলন। অসংখ্য রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও আন্তর্জাতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। কিন্তু সময়ের নিয়মে ও উত্তরবঙ্গের মানুষের মূল স্রোতে ফেরার ভাবনায়, চার বছর আগে অস্ত্র ছেড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও শান্তির পথ বেছে নেন জীবন। কেন্দ্রের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও হয়েছে তাঁর।
এখন বাড়ি ফেরার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি ফিরতে পারছেন না? জীবনের কথায় ফুটে ওঠে উত্তরবঙ্গের মানুষের অধিকার ও দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের কথা। তিনি জানান, যে দাবিদাওয়া নিয়ে তিনি এতদিন লড়াই করেছেন, তার একটিও এখনও পূরণ হয়নি। কেন্দ্র বা রাজ্যের কাছে তিনি বন্দি নন, তা স্পষ্ট করে তিনি বলেন, ‘আমাকে গ্রেপ্তার করে রেখেছে এমনটা নয়। চাইলে আমি ২-১ দিনের জন্য ঘরে যেতেই পারি। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা ভাবিনি। দাবি পূরণ না করে বাড়ি ফিরলে আমার এতদিনের লড়াইয়ের কী হবে?’ এই প্রশ্নের উত্তর চাইছেন তাঁর সংগঠনের নেতারাও।
মঙ্গলবার উত্তরকন্যায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে উত্তরের জাতি ও মাটির স্বার্থে আন্দোলনকারী বিভিন্ন সংগঠনের বৈঠক হয়। এখানেই জীবনের শারীরিক অবস্থার কথা তুলে ধরেন তাঁর সংগঠনের নেত্রী। মুখ্যমন্ত্রী সেখানেই জীবনের চিকিৎসার বিষয়ে অসমের মুখ্যমন্ত্রীকে জানানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। বৈঠকে সংগঠনগুলির মধ্যে যে তর্ক-বিতর্ক ও বাকবিতণ্ডা হয়েছে, তা একেবারেই ঠিক হয়নি বলে দাবি করেছেন জীবন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘কিছু বুদ্ধিজীবী ও নেতা জাতীয় এবং সর্বসাধারণের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের সংগঠনের ব্যক্তিগত স্বার্থকে বড় করে দেখছেন। লড়াইটা আমরা করেছি। কিন্তু আজ অনেকেই ব্যক্তিগত স্বার্থে কাজ করছেন।’
বর্তমান বিজেপি সরকারের কাছ থেকে অনেক আশ্বাস পেয়েছেন বলে স্বীকার করেন কেএলও প্রধান। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়েছে। বিজেপির আশ্বাসে ভরসা রেখেই গত চার বছর ধরে ভারতের মূল স্রোতে অবস্থান করছেন তিনি। তবে কি দীর্ঘ তিন দশকের দাবি পূরণ করেই তিনি পৈতৃক ভিটেয় ফিরবেন, নাকি স্মৃতির ভার আর স্বজনদের টান তাঁকে শেষ বয়সে ঘরে ফেরাবে? উত্তর লুকিয়ে রয়েছে ভবিষ্যতের রাজনীতিতে।

