জলপাইগুড়ি: বছর শেষের কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে জলপাইগুড়ি শহরের আকাশ যেন আরও ম্লান হয়ে গেল। মঙ্গলবার সকালে খবর এল, বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া (Khaleda Zia) আর নেই। এই দুঃসংবাদ পৌঁছানো মাত্রই শোকের ছায়া নেমে এসেছে জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri) শহরের নয়াবস্তি পাড়ায়। কারণ, এই শহরই ছিল বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীর জন্মভিটে। এখানকার মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন রাষ্ট্রনেতা ছিলেন না, ছিলেন ঘরের মেয়ে ‘পুতুল’।
১৯৪৫ সালে জলপাইগুড়ি শহরের নয়াবস্তি পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। শৈশবে তাঁর ডাকনাম ছিল পুতুল। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়েছিল শহরের স্বনামধন্য ‘সুনীতিবালা সদর প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এ (Suniti Bala Sadar Ladies)। তাঁর প্রয়াণের খবরে স্কুলের প্রধান শিক্ষক অরূপ দে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি জানান, “ইতিহাসের পাতায় এই স্কুলের নাম তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বিদ্যালয় এখন বন্ধ থাকলেও, আমরা কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁর স্মরণে একটি বিশেষ সভার আয়োজন করব।” তৎকালীন অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত জলপাইগুড়িতেই ছিল খালেদাদের সংসার। তাঁর বাবা মহম্মদ ইসকান্দর জলপাইগুড়ি শহরের নামী শেয়ার ও ব্যাঙ্কিং সংস্থা ‘দাশ অ্যান্ড কোম্পানি’তে কাজ করতেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে সম্পত্তি বিনিময় প্রথা মেনে চক্রবর্তী পরিবারের সঙ্গে জমি অদলবদল করে খালেদা জিয়ার পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায়। যে ভিটেতে খালেদা জিয়ার শৈশব কেটেছে, সেখানে এখন বসবাস করে সেই চক্রবর্তী পরিবারই।
দেশভাগের পর খালেদা জিয়া নিজে আর জলপাইগুড়িতে ফিরে না এলেও, তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা নিয়মিত এই শহরে যাতায়াত করতেন। নয়াবস্তি পাড়ার বাসিন্দা নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত ও অন্য প্রতিবেশীরা আজ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, তাঁদের কাছে এটি কোনো রাজনৈতিক শোক নয়, বরং প্রতিবেশী বিচ্ছেদের বেদনা। এক প্রতিবেশী বলেন, “খালেদারা যে বাড়িতে থাকতেন, তার পাশের বাড়িতেই আমার বাস। ওঁর আত্মীয়রা এলে এখনও আমার বাড়িতে ওঠেন। আমাদের কাছে উনি সব সময় আমাদের পাড়ার মেয়ে পুতুল হয়েই থাকবেন।”
মঙ্গলবারের এই ম্লান সকালে জলপাইগুড়ি যেন ক্ষণিকের জন্য ফিরে গিয়েছিল সেই স্বাধীনতার আগের দিনগুলোতে। জন্মভিটের মানুষগুলোর কাছে আজ রাজনীতি গৌণ, মুখ্য হয়ে উঠেছে শৈশবের সেই ‘পুতুল’-এর স্মৃতি, যিনি একদিন জলপাইগুড়ির ধুলোবালি মেখে বড় হয়ে একটি রাষ্ট্রের ভাগ্যবিধাতা হয়েছিলেন।
