রণবীর দেব অধিকারী, কালিয়াগঞ্জ: নেংটি পরে মাঠে নেমে আবাদের হালহকিকত বুঝছিলেন ধনকৈল গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার কৃষক কমল বর্মন। মাথায় প্যাঁচানো গামছা। ভোটের গরমের আঁচ তেমন নেই।
ভোটের কথায় কমলের গলায় তাচ্ছিল্যের সুর, ‘সবই তো এক। নেতারা নিজেদের স্বার্থে মৌমাছির মতো এক ফুল থেকে আরেক ফুলে ওড়াউড়ি করেন। সাধু হয়ে যান রাজনীতিবিদ। বহুরূপী দলবদলু নেতাদের এক্কাদোক্কা খেলায় আমরা স্রেফ ভোটার হয়ে থেকে যাই।’ কালিয়াগঞ্জে গত এক দশকে দলবদলের ছবি বারবার দেখা গিয়েছে।
সিপিএম জমানার পতনের পর কালিয়াগঞ্জে (Kaliyaganj) আগ্রাসী মেজাজে একের পর এক গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি ও পুরসভা দখল করেছিল তৃণমূল। লালঝান্ডা ছেড়ে জোড়াফুলে এসে ২০১৫ সালে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হয়ে যান নিতাই বৈশ্য। তিনি এবার কালিয়াগঞ্জে তৃণমূল প্রার্থী। কালিয়াগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হিরণ্ময় সরকার আপাদমস্তক তৃণমূল। তাঁরও অতীতে বাম ঘরানার ছাপ।
স্থানীয়রা আড়ালে মজা করে বলেন, তাঁর শরীর থেকে নাকি এখনও কাস্তে-হাতুড়ির গন্ধ ছড়ায়। উদাহরণ আরও আছে। কংগ্রেস ছেড়ে কার্তিকচন্দ্র পাল তৃণমূলে যোগ দিয়ে কালিয়াগঞ্জ পুরসভার বোর্ড উলটে দিয়েছিলেন। হাত চিহ্নে নির্বাচিত কাউন্সিলারদের হাত করে রাতারাতি পুর বোর্ড কংগ্রেসের হাত থেকে তৃণমূলের দখলে নিয়ে যাওয়ার নেপথ্য কারিগর ছিলেন কার্তিক।
‘হাত’ থেকে হাতিয়ে নেওয়া সেই বোর্ডে চেয়ারম্যানের আসনে বসেন তিনি। পরে আবার যোগ দেন বিজেপিতে। সেই কার্তিক এখন রায়গঞ্জের বিজেপি সাংসদ। গত লোকসভা ভোটে কার্তিকের মনোনয়নপত্রের অন্যতম প্রস্তাবক উৎপল ব্রহ্মচারী এবার কালিয়াগঞ্জে বিজেপির প্রার্থী। দলবদলের গল্প এখানেই শেষ নয়। ভিনজেলা থেকে উড়ে আসা বিদায়ি বিজেপি বিধায়ক সৌমেন রায় একই পথের পথিক।
একুশের ভোটে কালিয়াগঞ্জ থেকে পদ্ম প্রতীকে বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর সৌমেন কিছুদিনের জন্য চলে যান ঘাসফুল শিবিরে। অল্পদিনের মধ্যে ঘরওয়াপসি। গায়ে দলবদলু তকমা সেঁটে যাওয়ার কারণেই হয়তো এবার তাঁকে প্রার্থী করেনি বিজেপি। এই ভাঙাগড়ার খেলার ঠেলায় প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির খাসতালুক কালিয়াগঞ্জে সিপিএম তো বটেই, কংগ্রেস কোণঠাসা হতে হতে কার্যত পোস্টারে পরিণত হয়েছে।
আমজনতা মহাফাঁপরে। কে প্রকৃত তৃণমূল আর কে প্রকৃত বিজেপি, ঠাওর করতে না পেরে নটী বিনোদিনী যাত্রায় ঠাকুরের সংলাপের মতো অনেকে বলছেন, ‘আসল নকল সব একাকার হয়ে গেছে গো!’ তৃণমূল পরিচালিত পুরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালীন রেকর্ড দানখয়রাতির নজির গড়েছিলেন কার্তিক। তাই রাজনীতির ঊর্ধ্বে বহু মানুষের ‘হৃদয়ে’ তিনি। তাঁর দলবদল নিয়ে খুব একটা ভাবেন না কেউ।
কালিয়াগঞ্জে গুঞ্জন আছে, স্থানীয় বহু তৃণমূল নেতাই নাকি রাতের অন্ধকারে কার্তিকের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখেন। দুই ফুলের গোপন প্রেমের গোপন কথাটি অবশ্য গোপন থাকেনি। কিছুদিন আগে তৃণমূলের এক সভায় দলের উত্তর দিনাজপুর জেলা কমিটির চেয়ারম্যান হামিদুর রহমান একপ্রকার সেকথা স্বীকারই করেছিলেন।
কালিয়াগঞ্জের অনন্তপুর ও রাধিকাপুর অঞ্চলে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতার। ওই এলাকায় দালালদের যোগসাজশে মাঝেমধ্যেই মানুষ পাচার চলে। স্থানীয় একজন কানের কাছে ফিশফিশিয়ে বললেন, ‘এখানে রাত নামলে প্যাঁচার মতো সক্রিয় হয়ে ওঠে পাচারকারী চক্র। দালালদের হাত ধরে কয়েক হাজার টাকার বিনিময়ে কাঁটাতারের এপার-ওপার করে মানুষ।’
বেআইনি এই কারবারের মাথাদের কাউকে বিএসএফ তেমন ধরতে পারে না। তবে পুলিশ মাঝেমধ্যে দু-একজনকে পাকড়াও করে আদালতে পাঠায়। সীমান্তের জনপদ রাধিকাপুর অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে টাঙন নদী। যে তল্লাটে বালি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য। স্থানীয় বাসিন্দারা একযোগে জানালেন, নদীর বালি চুরিতে বিজেপি ও তৃণমূল- উভয় দলের একাংশের মদত রয়েছে।
সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে মাঝেমধ্যে দু-একটি বালিবোঝাই ট্র্যাক্টর-ট্রলি আটক করা হয় ঠিকই। কিন্তু বড় চক্রের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত বড় পদক্ষেপ করতে দেখা যায়নি। মোস্তাফানগর অঞ্চলের হাটপাড়া টেরাকোটা শিল্পের জন্য পরিচিত। এই শিল্পের উন্নয়নে সরকারি কার্যকর কোনও উদ্যোগ না থাকায় ক্ষুব্ধ শিল্পী মহল।
টেরাকোটাশিল্পী দুলালচন্দ্র রায়ের কথায়, ‘দেশ-বিদেশে কালিয়াগঞ্জের টেরাকোটাশিল্পের কদর থাকলেও স্থানীয় স্তরে আমাদের কোনও উন্নতি নেই। ক্লাস্টারের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে মাথার চুল সাদা হয়ে গেল। এভাবে চললে একদিন হাটপাড়ার এই শিল্প ইতিহাসের পাতায় চলে যাবে।’ হাটপাড়ার শিল্পীদের আক্ষেপের প্রতিধ্বনি যেন মালগাঁও অঞ্চলের কার্পেটশিল্পীদের গলায়।
মালগাঁওয়ের কার্পেটশিল্প আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেয়েছে শিল্পীদের চেষ্টায়। সরকার ক্লাস্টার গঠনের জন্য দীর্ঘদিন আগে প্রায় দেড় একর জমি চিহ্নিত করে রাখলেও নির্মাণ শুরু হয়নি। কার্পেটশিল্পী নিখিল বৈশ্যর গলায় ব্যঙ্গের সুর, ‘শিল্পের উন্নতির বদলে সরকারি মেলায় কার্পেটশিল্পীদের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে নেতারা বেশি ব্যস্ত।’
কালিয়াগঞ্জে শহরের নাগরিকদের মুখে নেইয়ের তালিকা দীর্ঘ। রাজ্য সড়কে ফুটপাথ নেই। পানীয় জলের রিজার্ভার আছে, জল নেই। বহু বাড়িতে পুরসভার জলের লাইন নেই। অর্ধনির্মিত স্টেডিয়ামটা প্রতি নির্বাচনে প্রচারের ইস্যু হয়ে ওঠে মাত্র।
