উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: রাজস্থানের গ্রামীণ যোধপুরে (Jodhpur) এক মর্মান্তিক ও নৃশংস অপরাধের ঘটনা কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর ধরে গণধর্ষণ, ব্ল্যাকমেইল এবং তোলাবাজির শিকার হয়ে গত মার্চ মাসে আত্মহত্যা করেছিলেন এক তরুণী। আর ঠিক তার দুই মাস পর, পুলিশের দরজায় কড়া নেড়েও বিচার না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন তাঁর ছোট বোনও।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যোধপুরের গ্রামীণ এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে চরম গাফিলতি এবং আসামিদের আড়াল করার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। নিহতদের অসহায় পিতা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের সূত্রপাত গত এপ্রিল মাসের ১১ তারিখে, যখন ছোট বোন পুলিশে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে জানানো হয়, স্থানীয় এক ‘ই-মিত্র’ (e-Mitra) পরিষেবা কেন্দ্রের পরিচালক মহিপাল তার বড় বোনকে ফাঁদে ফেলেছিল। মহিপাল অত্যন্ত গোপনে ওই তরুণীর কিছু আপত্তিকর ভিডিও রেকর্ড করে এবং তা হাতিয়ার করেই শুরু হয় ব্ল্যাকমেইল।
অভিযোগের খাতায় মহিপাল ছাড়াও শিবরাজ, গোপাল, বিজারাম, দিনেশ, মনোজ এবং পুখরাজ সহ মোট আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। ছোট বোনের অভিযোগ অনুযায়ী, মহিপাল ও তার সহযোগীরা গত চার বছর ধরে তার বড় বোনকে লাগাতার গণধর্ষণ করে আসছিল এবং ভিডিও ফাঁসের হুমকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছিল। এই নারকীয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গত ২০ মার্চ বড় বোন আত্মহননের পথ বেছে নেন।
বড় বোনের মৃত্যুর পর ছোট বোন পুলিশকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, অবিলম্বে যদি অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে বিচার নিশ্চিত না করা হয়, তবে তিনিও নিজের জীবন শেষ করে দেবেন। পুলিশ এফআইআর (FIR) দায়ের করলেও এক মাসেও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ।
বড় বোনের মৃত্যুর পরও অপরাধীদের তাণ্ডব থামেনি। ছোট বোনের দাবি অনুযায়ী, বড় বোনের আত্মহত্যার পর অভিযুক্তরা তার দিকে নজর দেয়। বড় বোনের সেই গোপন ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তারা ছোট বোনকেও যৌন নিপীড়ন করতে শুরু করে।
থানায় এফআইআর দায়ের হওয়ার পরও অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল এবং প্রতিনিয়ত তাকে হুমকি দিচ্ছিল। পুলিশ তাদের কিছুই করতে পারবে না—এমন দম্ভোক্তিও করেছিল তারা। অবশেষে, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থায় নিজের প্রতিবাদ ও আকুতি প্রশাসনের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে গত শুক্রবার ওই তরুণী একটি জলের ট্যাঙ্কের ওপর উঠে পড়েন এবং আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। এরপর তিনি বিষপান করেন; আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।
এই জোড়া আত্মহত্যার খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজস্থানের রাজপুত সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য এমডিএম (MDM) হাসপাতালের মর্গে রাখা হলে, তার বাইরে শয়ে শয়ে মানুষ জড়ো হয়ে তুমুল বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। প্রশাসনের সাথে দীর্ঘক্ষণ টানাপোড়েনের পর, অবশেষে নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্তের অনুমতি দেন।
মারওয়ার রাজপুত সোসাইটির সভাপতি হনুমান সিং খাংটা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তদন্তের শুরু থেকেই পুলিশ প্রশাসন অপরাধীদের বাঁচানোর জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। পুলিশের এই চরম অবহেলা এবং উদাসীনতার কারণেই আজ দুটি তরতাজা প্রাণ অকালে ঝরে গেল। ক্ষুব্ধ জনতা অবিলম্বে সমস্ত অভিযুক্তের গ্রেপ্তার এবং কর্তব্যরত গাফিলতিপূর্ণ পুলিশ কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে যোধপুরের পুলিশ সুপার (SP) পিডি নিত্যা জানিয়েছেন যে, মূল অভিযুক্ত মহিপাল সহ আরও এক আসামিকে ইতিমধ্যেই আটক করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারের আইনি প্রক্রিয়া চলছে। বাকি অভিযুক্তদেরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। একই সাথে, কর্তব্যরত যেসব পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে একটি উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত (Departmental Inquiry) কমিটি গঠন করার আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।
