Jalpesh | জল্পেশে ভিনজেলার ভিক্ষাজীবীরা, ভিড়ের মাঝে ভিটেছাড়াদের বাঁচার লড়াই

ভিডিও/VIDEO
Spread the love


অনীক চৌধুরী, ময়নাগুড়ি: মা কালী থেকে ভোলে ব্যোম, সবাই ওঁদের ‘পুঁজি’। তাই কখনও তারাপীঠ, কখনও কামাখ্যা ছুটে বেড়ান ওঁরা। জল্পেশেও এসেছেন। একা নন, দলে দলে। গায়ে শতছিন্ন পোশাক, খালি পা, ধূলিধূসরিত দেহ, এ সবই ওঁদের ‘ইউএসপি’। সারাদিনে কেউ ভাণ্ডারা থেকে, কেউ অন্য কোনওভাবে খাবার জুটিয়ে নিয়েছেন। বিকেল পর্যন্ত জিরিয়ে নিয়ে ওঁরা তৈরি পুণ্যার্থীদের অপেক্ষায় (Jalpesh)।

ওঁরা ভিনজেলার ভিখারি। তিস্তাঘাট স্টেশনে ট্রেন ঢুকতেই মানুষের ঢল নামলে সক্রিয় হন ওঁরা। একের পর এক দূরপাল্লার ট্রেন থেকে গেরুয়া পোশাকে হাজার হাজার পুণ্যার্থী নেমে তিস্তা নদীতে পুণ্যস্নান করে জল্পেশের উদ্দেশে হাঁটা শুরু করছেন। স্টেশন চত্বর, চার লেনের রাস্তা, জলসত্র, ভাণ্ডারা, সব জায়গাতেই যেন গেরুয়া-সমুদ্র। এরই মাঝে মায়াভরা মুখে ওঁরা বসে থাকেন ভিক্ষা পাওয়ার আশায়। কেউ নবদ্বীপ, পৈলান, মেদিনীপুর থেকে এসেছেন। কেউ কোচবিহার, কেউ আবার তারাপীঠ থেকেও এসেছেন এই শিবধামে।

এঁদের মধ্যে অনেকে ভিক্ষার জন্য হাত না পেতে শিবের নামে তিলক কেটে, হাতের লাল-হলুদ সুতো বিক্রি করেও উপার্জন করছেন। এত ভিড়ের মধ্যে স্থানীয় ভিক্ষুকদের সঙ্গে লড়াই না করে বরং মিষ্টি কথায় তাঁদের সহযোগী হয়ে আয়ের পথ বেছে নিয়েছেন অমরেন্দ্র, প্রতাপ, পুশুনি, বিভুরা। কেউ দিচ্ছেন এক টাকা, কেউ ভোলেবাবার নামে ৫০ টাকা। হাসিমুখেই দানে পাওয়া টাকা পুরছেন তাঁরা থলিতে।

সুদূর নবদ্বীপ থেকে আসা প্রতাপ রায় বলেন, ‘আমরা ১০ জন তিস্তা-তোর্ষায় করে এসেছি প্রায় এক মাস হল। কীভাবে দিনগুলো কেটে যাচ্ছে বুঝতেও পারছি না। কাউকেই এখানে সেভাবে চিনি না। কিন্তু সবকিছুর ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে। রবিবার করে এখানে ভাণ্ডারা থেকে খাওয়া হয়ে যাচ্ছে। বাকি দিনগুলো মন্দিরের প্রসাদ কিংবা আশপাশের এলাকা ঘুরে যা জোগাড় হচ্ছে সেটা দিয়ে দিব্যি চলছে। থাকছি ওই ফাঁকা ভাণ্ডারায়।’ তাঁর সঙ্গে মন্দির প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আরেক সঙ্গী দেবু বিহা জানালেন, ভিক্ষায় উপার্জনও খারাপ নয়। কোনও দিন ১০০ টাকা আসছে, তো কোনও দিন ৩০০০-৪০০০ টাকা। এখানকার মানুষ এবং অন্য ভিক্ষুকরাও সাহায্য করছেন বলে জানান তিনি।

এদিকে, কালিম্পং থেকে পরিবার নিয়ে জল্পেশে পুজো দিতে যাওয়ার আগে পকেটে থাকা প্রায় ১২০ টাকা নদীপাড়ে থাকা ভিক্ষুকদের মধ্যে ভাগ করে দিতে দেখা গেল বছর পঁয়তাল্লিশের অরুণ থাপাকে। টাকা ভাগ করে দেওয়ার সময় তাঁর মুখে ছিল মৃদু হাসি। তাঁর কথায়, ‘বছরে একবার করে জল্পেশে পুজো দিয়ে শ্রাবণীমেলায় ঘোরা হয়। বাবা জল্পেশের আশীর্বাদে ব্যবসা-বাণিজ্য ভালোই চলছে। সেই উপার্জন থেকে কিছুটা এই মানুষগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নিলাম। আশীর্বাদ চাইলাম সমৃদ্ধির।’

‘একটি পয়সা যদি পাওয়া যায় আরো—তবে আমি হেঁটে চ’লে যাবো মানে-মানে।’ জীবনানন্দ দাশের এই পংক্তিটিকে হয়তো পাথেয় করেই জল্পেশে উপার্জনের পথ প্রশস্ত করেছেন ওঁরা। তবে এভাবে আর কতদিন? উত্তর খুব সহজ। কোচবিহার থেকে আসা অমরেন্দ্র ঠাকুরের কথায়, ‘চার সপ্তাহ দেখতে দেখতে কেটে গেল। আর এক সপ্তাহ এই ফাঁকা ভাণ্ডারায় থেকে যাব। তারপর যে যার বাড়ির উদ্দেশে চলে যাব। দুর্গাপুজো সামনে। তখনও উপার্জন খারাপ হয় না। কিন্তু, এখানে রাস্তার পাশে হাত পেতে বসেও যে বন্ধুগুলো হয়েছে, তাদের সঙ্গে আগামী বছর আবার দেখা হবে এই আশায় বিদায় জানাব।’

বিদায় যে এখনই জানানো হচ্ছে না, তা পাশ থেকে পৈলানের পুশুনি দাস পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, ‘উনি আমাদের থাকতে বলেছেন জলপাইগুড়ি মনসাপুজোর মেলা দেখে যাওয়ার জন্য। ওখানেও ভালোই ভিড় হয়। আবার রাসমেলাতেও আসতে বলেছেন। দেখা যাক কী হয়।’



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *