সৌরভ দেব ও পূর্ণেন্দু সরকার, জলপাইগুড়ি: উত্তরবঙ্গের (North Bengal Information) মানুষের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ শনিবার আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে কলকাতা হাইকোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের (Jalpaiguri Circuit Bench) স্থায়ী ভবন। সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Courtroom) প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (CM Mamata Banerjee)— চাঁদের হাট বসতে চলেছে জলপাইগুড়ির পাহাড়পুরে। উদ্বোধনের আগে শুক্রবার দিনভর চলল শেষ মুহূর্তের মহড়া, বৈরাতি নৃত্য আর কড়া নিরাপত্তার প্রস্তুতি।
শনিবার জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী ভবনের উদ্বোধন। এই উপলক্ষ্যে শুক্রবার পুরোদমে মহড়া চলল। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে স্বাগত জানাতে বৈরাতি নৃত্য থেকে শুরু করে পুলিশ ব্যান্ড, সবই মহড়া অনুষ্ঠানে ছিল। কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta Excessive Courtroom) থেকে আসা বিচারপতিদের উপস্থিতিতে মহড়া অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কোন পুলিশকর্মী কোথায় কর্তব্যরত থাকবেন সেই বিষয়ে পুলিশের তরফে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আজ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জলপাইগুড়িতে কলকাতা হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। জলপাইগুড়িতে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিদের উপস্থিতিতে সার্কিট বেঞ্চের এই উদ্বোধন হবে। সেখান থেকে বাগডোগরা বিমানবন্দর হয়ে কলকাতা ফেরার কথা মমতার।
এদিকে, উদ্বোধনপর্বের মুহূর্তেও জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণ নিয়ে কোন্দল অব্যাহত। সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণে রাজ্য সরকার ৫০১ কোটি টাকা খরচ করেছে বলে এদিন এক সাংবাদিক সম্মেলনে তৃণমূল লিগ্যাল সেলের সভাপতি গৌতম দাস দাবি জানান। পরে আরেক সাংবাদিক সম্মেলনে বিজেপির জেলা মুখপাত্র ধীরাজমোহন ঘোষ বলেন, ‘স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণের পুরো এক্তিয়ার রাজ্যের। স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণে কেন্দ্র সরকার টাকা দেয়নি ঠিকই, কিন্তু সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণে যাবতীয় অনুমোদন কেন্দ্র সরকার দিয়েছে।’ স্থায়ী পরিকাঠামো নিয়ে এই টানাপোড়েনে ধীরাজের বক্তব্য তৃণমূলকেই এগিয়ে রাখল বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে। বিজেপির জেলা সভাপতি শ্যামল রায়ের অবশ্য দাবি, ‘স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণে কেন্দ্র অর্থ না দিলেও কেন্দ্র বিচার বিভাগীয় পরিকাঠামো উন্নতিতে অর্থ দিয়েছে।’
দীর্ঘ অপেক্ষার পর উত্তরবঙ্গ ইতিহাসের সাক্ষী হতে চলেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী, কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সহ অন্যান্য বিচারপতি, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রমুখ উপস্থিত থাকবেন। এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যাতে কোনও খামতি না থাকে সেজন্য হাইকোর্ট এবং জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ প্রথম থেকেই নজরদারি চালিয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চের চারটি গেটেই এদিন থেকে সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সাধারণের প্রবেশ কয়েকদিন আগে থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এদিন যাঁরা ভেতরে কাজ করছেন সিকিউরিটি পাস ছাড়া তাঁরা ঢোকার অনুমতি পাননি।
সকাল থেকেই সার্কিট বেঞ্চের মূল ভবনে আদিবাসী, রাভা, বৈরাতি সহ একাধিক নৃত্যশিল্পীদের দল দেখা গিয়েছে। এই শিল্পীরা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আগত সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সহ অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিকে নৃত্যের মাধ্যমে স্বাগত জানাবেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির গাড়ি কোন গেট দিয়ে কোথায় এসে দাঁড়াবে, নৃত্যশিল্পীরা কীভাবে অতিথিদের স্বাগত জানাবেন, প্রধান বিচারপতির গাড়ি সার্কিট বেঞ্চে প্রবেশের পরেই মঞ্চে কীভাবে ঘোষণা হবে, সব নিয়েই এদিন মহড়া চলে। মঞ্চের অনুষ্ঠান শেষ করে অতিথিরা সার্কিট বেঞ্চের নবনির্মিত ভবনের মূল প্রবেশদ্বারের ফিতে কাটবেন। এদিকে, পুলিশ সুপার ওয়াই রঘুবংশী জেলার সমস্ত পুলিশ আধিকারিককে নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। জলপাইগুড়ি জেলার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জেলা কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, দার্জিলিং এবং কালিম্পং থেকেও সার্কিট বেঞ্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য পুলিশ আধিকারিকদের নিয়ে আসা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে যে পুলিশকর্মীরা সাদা পোশাকে কর্মরত থাকবেন তাঁদের জন্য বিশেষ ড্রেসকোড করা হয়েছে।
শহরের মানুষ ও প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিজেপি এদিন সন্ধ্যায় মিছিল বের করে। অন্যদিকে সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে স্থায়ী ভবনের সামনে টাঙানো তৃণমূল নেতাদের সমস্ত হোর্ডিং পুলিশ খুলে দিয়েছে।
তৃণমূল লিগ্যাল সেল এদিন তড়িঘড়ি জেলা তৃণমূল অফিসে সাংবাদিক বৈঠক ডাকে। লিগ্যাল সেলের সভাপতি গৌতম দাস বলেন, ‘স্টেশন রোডে সার্কিট বেঞ্চের অস্থায়ী ভবন নির্মাণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৮০ কোটি টাকা খরচ করেছিলেন। একইভাবে পাহাড়পুরের স্থায়ী ভবন নির্মাণেও রাজ্য সরকার ৫০১ কোটি টাকা খরচ করেছে।’ সেলের কার্যনির্বাহী সদস্য সোমনাথ পাল এক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কৃতিত্ব দিয়েছেন। বিজেপির লিগ্যাল সেলের সদস্য সৌজিৎ সিংহ সার্কিট বেঞ্চ সংক্রান্ত বিষয়ে জলপাইগুড়ির সাধারণ মানুষকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
সার্কিট বেঞ্চ আন্দোলনের বর্ষীয়ান আইনজীবী কমলকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী পরিকাঠামো নিয়ে কোনও রাজনীতি চান না। উদ্বোধনী পর্ব ভালোয় ভালোয় মিটে এই ভবনে যাতে ভালোভাবে কাজ শুরু হয় সেটাকেই তাঁরা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বলে জানান।
