শুভাশিস বসাক ও আব্দুল লতিফ, ধূপগুড়ি ও গয়েরকাটা: রবিবারের অতিবৃষ্টির ফলে ডুয়ার্সের একাধিক জঙ্গলের ভিতর এখনও কিছু অংশে জল জমে রয়েছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর জঙ্গল থেকেও বন্যপ্রাণীরা বেরিয়ে আসছে লোকালয়ে৷ শুক্রবার জলপাইগুড়ির (Jalpaiguri) ধূপগুড়ি (Dhupguri) ব্লকের একাধিক জায়গায় একটি বুনো শুয়োরের হামলায় অন্তত নয়জন জখম হয়েছেন। আহতদের ধূপগুড়ি মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তিনজনকে জলপাইগুড়ি সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদিনই মোরাঘাটের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে গয়েরকাটা চা বাগানে হামলা চালায় একটি দঁাতাল। তার আক্রমণে দুজন জখম হন।
ঝাড়আলতা-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের বামনটারি, পূর্ব ডাউকিমারি ও ঝাড়আলতা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের একাধিক জায়গায় এদিন হামলা চালায় বুনো শুয়োরটি। মোরাঘাট রেঞ্জ ও বিন্নাগুড়ি ওয়াইল্ডলাইফ স্কোয়াডের বনকর্মীরা ঘটনাস্থলে যান। বিন্নাগুড়ি ওয়াইল্ডলাইফ স্কোয়াড সূত্রে খবর, নাথুয়া জঙ্গল থেকে বেরিয়ে লোকালয়ে চলে এসেছিল বুনো শুয়োরটি। পরে সেটিকে খুট্টিমারির জঙ্গলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্কোয়াডের রেঞ্জ অফিসার হিমাদ্রি দেবনাথ বলেন, ‘আহতদের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। এলাকায় নজরদারি চালানো হচ্ছে।’ পূর্ব ডাউকিমারির বাসিন্দা পূর্ণিমা রায় বলেন, ‘বাড়ির উঠোনে ঢুকে হামলা চালায়। কেউ সকালে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ব্রাশ করছিল। সেই সময় কামড়, গুঁতোয় আহত হয়েছেন অনেকে। একটি বুনো শুয়োর এভাবে হামলা করায় অবাক বনকর্মীরাও। বামনটারির বাসিন্দা স্বপ্না রায় জানান, আচমকাই বাড়ির সামনে এসে লাফিয়ে হামলা চালায় শুয়োরটি। তখনই দুজন আহত হয়েছেন। তাঁদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ইতিমধ্যে মোরাঘাট, নাথুয়া, বিন্নাগুড়ি ওয়াইল্ডলাইফ স্কোয়াডের বনকর্মীরা এলাকায় নজরদারি শুরু করেছেন।
এদিন গয়েরকাটা চা বাগানে দাঁতালের হামলায় গুরুতর জখম হন প্রদীপ কুজুর (৪৫) ও চিরু ওরাওঁ (৬৫)। দুজনেই গয়েরকাটা চা বাগানের মুন্সি লাইনের বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বিকেল ৪টে নাগাদ গয়েরকাটা চা বাগানের ৯ নম্বর সেকশনে কীটনাশক স্প্রে-র কাজ করছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। হঠাৎ বিগুলঝোরা পেরিয়ে বাগানে ঢুকে পড়ে একটি দঁাতাল। তার সামনে পড়ে যান মোষ চরাতে যাওয়া বৃদ্ধ চিরু ওরাওঁ। দাঁতালটি তঁাকে শুঁড়ে তুলে আছাড় মারে। সেই সময় ওই পথ ধরে বাগানের ম্যানেজারের গাড়ি ফিরছিল। গাড়ির শব্দে দাঁতালটি চিরুকে ছেড়ে চা বাগানের ভিতর দিকে দৌড় দেয়। বাগানের রাস্তায় তখন ট্যাংকার থেকে কীটনাশক ভরছিলেন প্রদীপ। হঠাৎ দাঁতালটিকে ছুটে আসতে দেখে জ্ঞান হারান তিনি। তাঁকে বাঁচাতে অন্য শ্রমিকরা তাঁকে টেনে তুলে প্রথমে একটি স্কুটিতে ওঠানোর চেষ্টা করেন। ততক্ষণে দাঁতালটি একেবারে কাছে চলে আসায় তাঁরা প্রদীপকে কোনওমতে ট্যাংকারের নীচে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজেরা পালিয়ে যান। দাঁতালটি কীটনাশক ভর্তি ট্যাংকারটি উলটে দিলে গুরুতর আহত হন ওই চা শ্রমিক। পরবর্তীতে শ্রমিকরা চিৎকার শুরু করলে হাতিটি কিছুটা দূরে চা বাগানের মধ্যে দঁাড়িয়ে থাকে। পরবর্তীতে আহত দুজনকে উদ্ধার করে প্রথমে বাগানের হাসপাতালে এবং সেখান থেকে বীরপাড়া রাজ্য সাধারণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় পরবর্তীতে তাঁদের উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানেই তাঁদের চিকিৎসা চলছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান মোরাঘাট রেঞ্জ ও বিন্নাগুড়ি বন্যপ্রাণ দপ্তরের কর্মীরা। বনকর্মীদের চেষ্টায় হাতিটিকে মোরাঘাটের জঙ্গলে ফেরানো হয়।
বাগান শ্রিমক সুরেশ লাকড়া বলেন, ‘চোখের সামনে হাতির আক্রমণ দেখলাম। মনে হল, যমদূতের হাত থেকে বরাতজোরে বাঁচলাম। বনকর্মীরা না এলে আরও ক্ষতি হতে পারত।’ বিন্নাগুড়ি ওয়াইল্ডলাইফ স্কোয়াডের রেঞ্জ অফিসার বলেন, ‘গয়েরকাটা চা বাগানে হাতির হামলায় দুজনের আহত হওয়ার খবর পেয়ে তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। দাঁতালটিকেও জঙ্গলে ফেরত পাঠানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী আহতদের চিকিৎসার খরচ বহন করবে বন দপ্তর।’
