নববর্ষে বিরাটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প করতেন রবীন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতনে এই দিনটি ছিল তাঁর কাছে পরস্পরের কাছে আসার উৎসব হিসেবে। বড়দের প্রণাম, ছোটদের সম্ভাষণ, সমবয়সিদের কোলাকুলি ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে মানুষে মানুষে নৈকট্যের বার্তা দেওয়ার প্রয়োজন বুঝেছিলেন তিনি। বৈশাখের এই দিনটিতে রবীন্দ্রনাথের সংকল্প ছিল, ‘মুছে যাক গ্লানি/ ঘুচে যাক জরা।’ অথচ ১৪৩২ আমাদের জীবনকে গ্লানিতে ভরিয়ে দিচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘একসূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন’-এর বদলে খণ্ড খণ্ড হয়ে, পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ বুকে নতুন বছরের সূচনা হচ্ছে যেন। মোথাবাড়ি সতর্ক করেছিল। আমরা শিক্ষা নিইনি। রক্তাক্ত হয়ে গেল সামশেরগঞ্জ, সুতি, ধুলিয়ান। রাজনীতির ছোঁয়ায় পুলিশের পর নামল আধাসেনা। তা সত্ত্বেও বিভেদ ছড়িয়ে গেল মালদা, কান্দি, এমনকি শিলিগুড়িতে। ঘটনাগুলি যত ছোটই হোক বা যত নিয়ন্ত্রণেই থাক, রবীন্দ্রনাথের ঐক্য চেতনার এক বিপরীত স্রোত বয়ে চলেছে যেন।
কিছু মানুষ জীবিকাচ্যুত হয়ে এক অস্থির সময়ের মধ্যে পড়লেন নতুন বছরে। অপরাধ যারই হোক, সেখানেও যোগ্য-অযোগ্যের বিভাজন। পরস্পরের প্রতি দোষারোপের পালা ক্লেদ বইয়ে দিচ্ছে সমাজের বিভিন্ন স্তরে। কবিরা প্রশ্ন তুলছেন, ধর্ষণ কি শুধু যৌনাঙ্গে হয়, মস্তিষ্কে হয় না? অযোগ্য শব্দটি উচ্চারণের সুযোগ তৈরি হল যাঁদের পাপে, তাঁদের বিরুদ্ধে বরং ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ হতে পারত নববর্ষের সংকল্প।
বদলে পারস্পরিক সন্দেহ বিষিয়ে দিচ্ছে জীবিকার জন্য লড়াইয়ের ঐক্যবদ্ধ পরিবেশকে। মস্তিষ্কে ধর্ষণের কারণেই প্রতিবেশীকে, সহ নাগরিকের প্রতি এত সন্দেহ, এত ঘৃণার চাষ হয়ে চলেছে চারদিকে। যার ফসল মোথাবাড়ি থেকে শিলিগুড়ি- একের পর এক অশান্তির বাতাবরণ। হিংসায় কেউ হারাচ্ছেন প্রাণ, কেউ হারাচ্ছেন স্বজন। কারও বাড়ি জ্বলছে, কেউ ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন। ধর্মীয় কারণে উচ্ছেদ হওয়ার পুরোনো স্মৃতি বিভীষিকা হয়ে ফিরছে কারও কারও জীবনে। অসহনীয় রূঢ় বাস্তব!
রবীন্দ্র চেতনার বিপরীতে আমাদের কেউ কেউ বিদ্বেষ ভাবনায় প্রভাবিত হচ্ছেন। যে ভাবনা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে পরিকল্পনামাফিক। কখনো-কখনো বিদেশের মাটি থেকে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ চলছে। কবির ভাষায় যাকে বলা যেতে পারে, ধর্ষিত হচ্ছে মস্তিষ্ক। শুভচিন্তার বদলে হৃদয়ে তাই ঠাঁই পাচ্ছে ভিনজাত, ভিনধর্মের প্রতি আক্রোশ, ঘৃণা। মৌলবাদ এখন পৃথিবীজুড়ে মানবতার সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। যে মৌলবাদ বিভিন্ন ধর্মের বেশ ধরে আসে।
যে বেশেই আসুক না কেন, মৌলবাদের লক্ষ্য বিনাশ, নিধন। আন্তর্জাতিকতাবাদের যে চিন্তা রবীন্দ্রনাথ ছড়িয়েছিলেন, তার স্থান নিচ্ছে সংকীর্ণ জাতীয়তার ভাবনা। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে রাজনীতির নামে মতাদর্শগত বিচ্যুতি ভয়ংকর বিপদকে জড়িয়ে দিয়েছে আমাদের জীবনে। মোথাবাড়ি থেকে মুর্শিদাবাদ- গুজবের চাষ সম্প্রসারিত করে চলেছে মৌলবাদ। কখনও দেশের গণ্ডির মধ্যে থেকে, কখনও সীমানা পার হয়ে অন্য ভূখণ্ড থেকে সেই চক্রান্ত অবিরাম হয়ে চলেছে।
ঐক্যবদ্ধভাবে সেই বিদ্বেষ ঠেকানো যেখানে নববর্ষের সংকল্প হওয়া উচিত, সেখানে একদল মানুষ সেই চক্রান্ত বুঝেও তাতে শামিল হয়ে যাচ্ছেন শুধু সংকীর্ণ ভাবনায় প্রভাবিত হয়ে। মৌলবাদ আমাদের সমাজ জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে। তাকে আটকানোর চেষ্টা না করে প্রতিবেশীকে, ভিনধর্মকে, ভিনজাতকে অহেতুক শত্রু ঠাউরে ফেলার খেলা চলছে।
মোথাবাড়ির দুই ধর্মের দুই শিশুর একসঙ্গে মিড-ডে মিল খাওয়ার যে ছবি ভাইরাল হয়েছে, তা আমাদের আশার উদ্রেক করে বটে। কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে যে, এই ছবিকেও বিষিয়ে দিতে তৎপরতা কম নয়। নতুন বছর আমাদের অনিবার্য মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দেয় বটে। কিন্তু জীবন যতক্ষণ, ততক্ষণ অনন্ত আনন্দবোধে নিজেদের জারিত রাখার সুযোগ হেলায় নষ্ট করে চলেছি আমরা। এই বিষবৃক্ষের বিনাশই হতে পারে এবারের নববর্ষের সংকল্প।
