শুভদীপ শর্মা ও গোপাল মণ্ডল, ক্রান্তি ও বানারহাট: পরপর দু’দিন চিতাবাঘের হামলা জলপাইগুড়ির (Jalpaiguri) ক্রান্তি ব্লকের সুবর্ণপুর চা বাগানে। বৃহস্পতিবার বাগানের ৪ নম্বর সেকশনে কাজ করার সময় প্রদীপ রায় (৪৫) নামে এক চা শ্রমিকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে একটি চিতাবাঘ। তাঁর চিৎকারে আশপাশের শ্রমিকরা ছুটে এলেও বুনোটি ততক্ষণে তাঁর গলা খুবলে নিয়ে পালিয়ে যায়। এদিকে, বানারহাটের দেবপাড়া চা বাগানের ২৬ নম্বর সেকশনে দুটি চিতাবাঘকে ছোটাছুটি করতে দেখে আতঙ্কে পালিয়ে আসেন শ্রমিকরা। এদিন আর ওই সেকশনে কাজ হয়নি। পরে বন দপ্তর পটকা ফাটালেও বুনো দুটির আর হদিস পাওয়া যায়নি।
চিতাবাঘ ধরতে সুবর্ণপুরে খাঁচা পাতা হয়েছে। প্রয়োজনে দেবপাড়াতেও খাঁচা পাতা হবে বলে জানিয়েছেন বনকর্তারা। ডুয়ার্সের চা বাগান ও লাগোয়া গ্রামগুলিতে একের পর এক চিতাবাঘের হামলায় যেমন দিশেহারা বন দপ্তর তেমনই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নাগরাকাটা আংরাভাসা-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের খেরকাটা গ্রামে বাড়ির সামনে থেকে এক নাবালককে তুলে নিয়ে যায় একটি বুনো। তারপর টানা দু’দিন চিতাবাঘের হামলায় দুজনের আহত হওয়ার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে ক্রান্তি ব্লকের রাজাডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের উত্তর বারোঘরিয়া গ্রামে। গত দু’দিনে এই গ্রামে দুজন আহত হয়েছেন চিতাবাঘের হামলায়। বুধবার সুবর্ণপুর বাগানের ৭ নম্বর সেকশনে আবু শাহেদ (১৮) নামে এক তরুণ তাঁর বাড়ির গোরুকে মাঠে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে যান। সেই সময় লাগোয়া সুবর্ণপুর চা বাগান থেকে একটি চিতাবাঘ তাঁর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘটনার পর এদিন ওই এলাকায় খাঁচা পাতেন বন দপ্তরের আপালচাঁদ রেঞ্জের বনকর্মীরা। স্থানীয়দের নিয়ে সচেতনতা শিবিরও করা হয় এদিন দুপুরে। তবে বনকর্মীরা চলে যেতেই এলাকায় ফের চিতাবাঘের হামলার ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার দুপুর দুটো নাগাদ বাগানের ৪ নম্বর সেকশনে অন্যদের সঙ্গে পাতা তুলছিলেন চা শ্রমিক প্রদীপ রায় (৪৫)। সেই সময় হঠাৎই একটি চিতাবাঘ তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁর গলায় খুবলে দেয় বুনোটি। আশপাশের শ্রমিকরা তাঁকে উদ্ধার করে মালবাজার সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালে নিয়ে যান চিকিৎসার জন্য। বর্তমানে সেখানেই মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন ওই শ্রমিক।
স্থানীয় বাসিন্দা আলিউল ইসলাম, রেজাবুল হকরা জানান, প্রায় প্রতিদিনই গ্রামে দেখা মিলছে চিতাবাঘের। বুধবার সন্ধ্যায় এলাকায় কবরস্থানের পাশে রাস্তার ওপর একটি চিতাবাঘকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। বন দপ্তরে খবর দিলে তারা পটকা ফাটিয়ে চলে গেলে ফের চিতাবাঘের দেখা মেলে। গত মাসের ২৭ তারিখ চিতাবাঘের হামলায় আহত হন এক গ্রামবাসী।
পরপর চিতাবাঘের হামলা হলেও বন দপ্তর নির্বিকার বলে অভিযোগ তোলেন স্থানীয়রা। স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান মিন্টু রায় চিতাবাঘের হামলা রুখতে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের আর্জি জানিয়েছেন বন দপ্তরের কাছে। বন দপ্তরের আপালচাঁদের রেঞ্জ অফিসার নবাঙ্কুর ঘোষ বলেন, ‘বাগানে কাজ শুরু করার আগে শ্রমিকদের টিন বাজিয়ে বা পটকা ফাটিয়ে কাজ শুরু করার জন্য বলা হয়েছে। প্রয়োজনে এলাকায় আরও খাঁচা পাতা হবে।’
এদিন বানারহাট ব্লকের দেবপাড়া চা বাগানে ২৬ নম্বর সেকশনে দুটি চিতাবাঘকে ছোটাছুটি করতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন শ্রমিকরা। বাগান কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি ওই সেকশনে কাজ বন্ধ করে দেন। পাশের সেকশনগুলিতেও সচেতন হয়ে কাজ করতে বলেন। খবর পেয়ে বিন্নাগুড়ি বন্যপ্রাণ শাখার কর্মীরা এসে আশপাশে বাজি-পটকা ফাটিয়ে শ্রমিকদের আতঙ্ক কাটানোর চেষ্টা করেন। রিয়াবাড়ি, পলাশবাড়ি, কাঁঠালগুড়ি ও কারবালা চা বাগান এলাকাতেও চিতাবাঘ নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচার করছে বানারহাট রেঞ্জ। দেবপাড়া চা বাগানের সিনিয়ার ম্যানেজার প্রসেনজিৎ ঘোষ দাবি করেন, ‘গত দু-তিনদিন ধরে আমরা বাগানে চিতাবাঘ দেখছি। আগেও বন দপ্তরকে খাঁচা পাতার কথা বলা হলেও তারা খাঁচা পাতেনি৷ এদিন কয়েকটি সেকশনে কাজ বন্ধ রাখি।’ বাগানের শ্রমিক বোতরু ওরাওঁ বলেন, ‘এদিন কাজ করার সময় বাগানে দুটি বাঘকে ঘোরাঘুরি করতে দেখি। বাগানে খাঁচা পাতা হোক, এটাই দাবি।’ বিন্নাগুড়ি বন্যপ্রাণ শাখার রেঞ্জ অফিসার হিমাদ্রি দেবনাথ বলেন, ‘বাগানে গিয়ে নজরদারি করা হয়েছে। প্রয়োজন বুঝে খাঁচা পাতা হবে।’
