জলপাইগুড়ি ব্যুরো: পশ্চিম সাঙ্গপাড়ার হিম সরকার, জুরান রায়, চিত্তরঞ্জন দাস, কেশব দাসরা ধান লাগিয়েছিলেন এবার। আর কয়েকটা দিন! তারপরই ধান ঘরে তুলতেন। কিন্তু শনিবার রাতের প্রবল বৃষ্টি সব শেষ করে দিল। চ্যাংমারির সুভাষ বিশ্বাসের পরিস্থিতিও এখন এক। চার বিঘা জমিতে চাষ করেছিলেন পটল, বেগুন সহ একাধিক সবজি। সবটাই জলে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মাথায় হাত পড়েছে। জলপাইগুড়ির (Jalpaiguri) কৃষিবলয়ে এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। ময়নাগুড়ি, ক্রান্তি, ধূপগুড়ির বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষিজমিতে পলি পড়ে, জল জমে ফসল নষ্ট হয়ে গিয়েছে। প্রায় ২০০০ হেক্টর জমির আমন ধান কার্যত শেষ। শীতের জলদি সবজিরও ক্ষতি হয়েছে।
ময়নাগুড়ি (Mainaguri) ব্লকের রামশাই, আমগুড়ি, চূড়াভাণ্ডার, পদমতি, ধর্মপুর, বার্নিশ ইত্যাদি এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ সব থেকে বেশি। বন্যা পরিস্থিতির কারণে সেখানের আমন ধান চাষে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সরকারি হিসেব বলছে, প্রায় ৬০০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বেসরকারি হিসেবে সেই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। অনেক জায়গায় ধানের জমির ওপর আবর্জনার স্তূপ এসে জমা হওয়ার কারণে ধান নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এছাড়া ফুলকপি, বাঁধাকপি, পটল, মুলো ইত্যাদি সবজি চাষেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ময়নাগুড়ির ব্লক কৃষি আধিকারিক কমলেশ বর্মন বললেন, ‘বাংলা শস্যবিমা যোজনার মাধ্যমে যাতে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন সেজন্য বিভিন্ন এলাকায় কৃষি দপ্তরের তরফে শিবির করা হচ্ছে।’
ধূপগুড়ি ব্লকে আমন ধানে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ প্রায় ৬৫০ হেক্টর। বানভাসি গধেয়ারকুঠির তিন গ্রাম মিলিয়ে প্রচুর কৃষিজ ফসল নষ্ট হয়েছে। জলের ধাক্কায় কুর্শামারি, বগরিবাড়ি ও ভান্ডানি এলাকায় ধানখেতের জমি এবং সিমের জাংলা ভেঙে গিয়েছে। তিন গ্রাম মিলিয়ে প্রায় ৯০০ হেক্টর জমিতে সিম চাষ হয়েছিল। একইসঙ্গে শস্যবিমা নিয়েও জোর দিয়েছেন কৃষি আধিকারিকরা। তবে শুধু গধেয়ারকুঠি নয়, সাঁকোয়াঝোরা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের পূর্ব মাগুরমারিতেও ধান এবং সিম চাষের জমিতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের কথায়, যে সমস্ত জমিতে পলি ভেসে এসেছে, সেই জমির ধান ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। স্থানীয় কৃষক সরেশ রায়ের আক্ষেপ, ‘জলের তোড়ে সিমখেতের জাংলা ভেঙে গিয়েছে। কোথায় গাছ আর কোথায় জাংলা, কিছুই বোঝার উপায় নেই। একদিকে বাড়িঘর ডুবে গিয়েছে, অন্যদিকে উৎপাদিত ফসলও নষ্ট। কী যে করব, বুঝতে পারছি না।’ চাষের জমি, বাড়িঘর কী অবস্থায় রয়েছে, সেটাও জানেন না কৃষকরা।
সোমবার রাজ্য কৃষি দপ্তরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ওমকার সিং মিনা সহ জেলার কৃষি আধিকারিকরা এদিন গধেয়ারকুঠি গ্রাম পঞ্চায়েতের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি ঘুরে দেখেছেন। তাঁর কাছে জেলা আধিকারিকরা সমস্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। একই সঙ্গে হর্টিকালচার দপ্তরও নিজেদের মতো করে সবজি চাষ নিয়ে ক্ষয়ক্ষতি খতিয়ে দেখছেন।
ছবিটা এক ক্রান্তি ব্লকেও। চ্যাংমারি, রাজাডাঙ্গা, ক্রান্তি, চাঁপাডাঙ্গার নদীতীরবর্তী এলাকাগুলি জলমগ্ন। মরশুমি আনাজ মুলো, বরবটি, বেগুন, লংকা, পটলখেত- সবই এখন জলের তলায়। সরকারিভাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা বলে জানা গিয়েছে।
তবে রবিবার এবং সোমবার বৃষ্টি না হওয়ায় চা বাগানগুলো থেকে জল নেমে যাওয়ায় কিছুটা রক্ষা পেয়েছেন কৃষকরা। ক্রান্তি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি পঞ্চানন রায় বললেন, ‘সবজিচাষিরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ফলে আগামীদিনে সবজির দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশাসন যতটা সম্ভব পাশে থাকছে।’
