বিশ্বজিৎ প্রামাণিক, কুমারগঞ্জ: স্কুলের জানলা খুললে দেখা যায় কাঁটাতারের বেড়া। মাঝেমধ্যেই সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর জওয়ানরা টহল দেন। দক্ষিণ দিনাজপুরের (Dakshin Dinajpur) কুমারগঞ্জ (Kumarganj) ব্লকে মুন্সিপাড়ায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অদূরে ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জলেশ্বরী প্রাথমিক বিদ্যালয় (Jaleshwari Major Faculty)। উদ্দেশ্য ছিল, এই গ্রাম ছাড়াও আশপাশের জনবসতির আদিবাসী পরিবারের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষাদান।
একসময় কচিকাঁচাদের কলরবে মুখরিত ছিল প্রাঙ্গণ। হেসে খেলে বেড়াত ওঁরা। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ থেকে ভেসে আসতো অ, আ… ক, খ…। কিন্তু ছবিটা ধীরে ধীরে পালটাতে শুরু করল একসময়। কমতে লাগল পড়ুয়া সংখ্যা। নতুন করে ভর্তির উৎসাহে ভাটা এল। এখন স্কুলটিতে পড়ুয়া রয়েছে মাত্র আটজন।
আর সাত বছর পেরোলেই একশো বছরের পা দেব এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রধান শিক্ষক অপূর্ব বসাকের যুক্তি, ‘পাশের গ্রামে এসএসকে হওয়ায় অনেকটাই কমেছে।’ একই কথা শোনালেন স্থানীয় গ্রামবাসীও। মুন্সিপাড়া ছাড়া পাশের উলিপুর, দেবীপুর থেকে খুদেরা আসত এখানে। তবে, দেবীপুরে এসএসকে গড়ে ওঠার পর থেকে তাদের অধিকাংশকেই সেখানে সরিয়ে নেন অভিভাবকরা। বর্তমানে এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা দুই। পড়ুয়া, শিক্ষক- উভয় সংকটে ভোগা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে নদী পারাপার। এই গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে ইছামতী। অন্যপাড়ে মেনাপুর গ্রাম। সেতু নেই, তাই ওপার থেকে আসতে হলে নদীতে নেমে হেঁটে পার হতে হয়। বর্ষায় জল স্তর বৃদ্ধি পেলে যাতায়াত বন্ধ। ঘুরপথ অনেকটা দূরত্ব। ফলে মেনাপুর থেকেও ছেলেমেয়েরা আর আসতে চায় না। এছাড়া রয়েছে সীমান্তঘেঁষা এলাকা নিয়ে একাংশ পরিবারের মনে থাকা নিরাপত্তহীনতা। স্থানীয় সুন্দরী মুর্মু বলছিলেন, ‘নদীতে সেতু নেই। তাই অনেকেই গ্রাম ছেড়ে পাকাপাকিভাবে অন্যত্র চলে গিয়েছেন। এখন যাঁরা আছেন, তাঁদের বেশিরভাগের সন্তান শহরে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে। আমার মেয়ে পাশের গ্রামে এসএসকে-তে পড়তে যায়।’ গ্রামে বিদ্যালয় থাকতে অন্যত্র কেন? সুন্দরীর দাবি, ‘এই স্কুলের অবস্থা ভালো না। মাত্র দুজন শিক্ষক। তাই ওখানে পাঠিয়েছি। এক ক্লাসে অনেকের সঙ্গে থাকলে লেখাপড়ায় আগ্রহ বাড়ে।’ স্কুলে পড়ুয়া টানতে আনুসঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। চাই ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা, আদর্শ পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণ। মুন্সিপাড়ায় এসবের অভাব ভীষণরকম। শিক্ষার অধিকারের চাইতে এখানে স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য লড়াই বড় হয়ে উঠেছে।
