অনন্যা দে চট্টোপাধ্যায়, জয়গাঁ: সোশ্যাল মিডিয়া আর অনলাইনের ডেটিং-এর (On-line relationship) বর্তমান দুনিয়ায় অনেক প্রেম এখন সপ্তাহ পার করে না। সঙ্গী পছন্দ না হলে ‘সোয়াইপ’ করে পরের ‘অপশন’-এ ঝাঁপানোই এখন ট্রেন্ডিং। দ্রুতগতির এই সময়ে হাত ছেড়ে এগিয়ে যাওয়ার এই সময়ে বেশিরভাগ সম্পর্ক ৬৫ দিন স্থায়ী হয় না। এইরকম অস্থির সময়ে দাঁড়িয়ে জয়গাঁর (Jaigaon) নারায়ণ এবং বীণা সিং-এর দাম্পত্যর আয়ুষ্কাল আমাদের আশা জোগায়। তাঁদের বিয়ের বয়স ‘মাত্র’ ৬৫ বছর।
এত দীর্ঘ দাম্পত্যের রহস্য জিজ্ঞাসা করায় নারায়ণ বলেন, ‘সম্পর্কে থাকা মানে একে অপরকে দামি উপহার দেওয়া, সোশ্যাল মিডিয়াতে ফোটো দেওয়া না। সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী করতে একে অপরকে সম্মান দিতে হবে।’ তিনি যোগ করেন, ‘জীবনের রাস্তা সবসময় মসৃণ হবে না। বরং চড়াই উতরাই-ই বেশি। খারাপ সময়ে একে অপরকে আগলে রাখতে হবে।’ নারায়ণের কথার রেশ টেনে বীণা বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা ধৈর্য ধরতে হবে, তাড়াহুড়ো করে কিছু হয় না।’ কথার শেষে দুজনের মুখেই ছড়িয়ে পড়ে উজ্জ্বল এবং নরম একটা হাসি। আসলে ৬৫ বছরের পার্টনারশিপ তো, একে অপরের মনের কথা বোঝাতে ওদের শব্দের প্রয়োজন হয় না।
ওঁদের ভালোবাসা আজও প্রথমদিনের মতো। একসঙ্গে ওঁদের দুজনকে দেখে এই শীতেও বসন্তের ওম অনুভূত হয়। নারায়ণ পেশায় শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের তিন সন্তান আছে। সন্তানরা বাইরে থাকেন। উৎসব অনুষ্ঠানে বাবা-মায়ের কাছে আসেন। নারায়ণ বলেন, ‘পরিবার খুশি থাকলেই আমরা খুশি। আমরা বয়স্ক মানুষ, সারাটা বছর একা একাই থাকি, উৎসবের সময় ছেলেমেয়ে নাতি-নাতনি বাড়িতে এলে, পুরো ঘর ভরে ওঠে।’
নারায়ণের বয়স এখন ৮৩, বীণার ৭৫। জাঁকিয়ে বসা এই শীতে ৬৫টা বসন্ত একসঙ্গে পার করা দম্পতি জানান, ভালোবাসার কোনও দিন হয় না। প্রতিটা দিনই ভালোবাসার। পাশে থাকার। একে অপরের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, একে অপরের ভালোতে বাস করতে হবে; তবেই সম্পর্ক দীঘস্থায়ী হবে।
নারায়ণ বলেন, ‘আমার স্ত্রী এখনও আমাকে আর এই ঘর সামলে চলেছে। কখনও কোনও অভিযোগ শুনিনি ওর মুখে। এখন শুনি সকলের অনেক সমস্যা। সমস্যা তো থাকবেই। কিন্তু ধৈর্য সহকারে সেই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। তবেই না সম্পর্কের সফলতা।’
ফের বীণা নারায়ণের কথার রেশ টেনে বলেন, ‘কোন ছোটবেলায় বিয়ে হয়েছিল। তারপর থেকে তো এই সংসার আর স্বামীর সঙ্গে বেঁধে বেঁধে থাকলাম। কোনওদিন মনে হয়নি আমি পরাধীন। আসলে সবটাই মানসিকতা। আমি তো বলব যারা এখন সম্পর্কে আছে, তাদের উচিত একে অপরের যত্ন নেওয়া, পাশে থাকা। রাগের মাথায় যা খুশি তাই বলে দেওয়াই যায়, কিন্তু রাগ পড়লে বোঝা যায়, সেই কথার ওজন কতটা। তাই সম্পর্কে থাকলে কথা বলার বিষয়েও যত্নবান হতে হবে।’
৬৫ বসন্ত পেরোনো এই দম্পতির কথা শুনে মনে হয় ভালোবাসা আসলে একটা গাছ। তাকে যত্ন, বিশ্বাস আর ধৈর্যের সার দিলে, সেই গাছ জীবনের সমস্ত ঋতুতে আমাদের আগলায়, ছায়া দেয়।
