উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: আমেরিকা ও ইজরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের পর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইরান। এর ফলে ইতিমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতি বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। তবে এবার তেহরানের নজর পড়েছে হরমুজ প্রণালীর তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন ইন্টারনেট কেবল বা যোগাযোগ তারের ওপর। এই তারগুলির মাধ্যমেই মূলত ইউরোপ, এশিয়া এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলির মধ্যে সামগ্রিক ইন্টারনেট সংযোগ ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক লেনদেন সচল থাকে।
ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই জলতলের তারের সুরক্ষার বদলে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি সংস্থাগুলির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ভাড়া বা শুল্ক দাবি করেছে তেহরান। প্রশাসন পরোক্ষভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, এই দাবি মানা না হলে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট পরিষেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করা হতে পারে। এমনকি ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ স্পষ্ট জানিয়েছেন, “ইন্টারনেটের তারেও এবার আমরা ভাড়া চাপাব।” রেভল্যুশনারি গার্ডের ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, এই নিয়ম কার্যকর হলে গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের মতো বহুজাতিক প্রযুক্তি জায়ান্টদের ইরানের আইন মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি, এই তারগুলির রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের একচেটিয়া দায়িত্বও দিতে হবে কেবল ইরানি সংস্থাগুলিকেই।
ভৌগোলিক দিক থেকে হরমুজ প্রণালী হলো পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে প্রবেশের মূল পথ। এই অঞ্চলের গভীর সমুদ্রে বিছানো তারগুলো বিশ্ব যোগাযোগের মেরুদণ্ড। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নেটওয়ার্কের সামান্য ক্ষতি হলেও ভেঙে পড়তে পারে আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা, বিভিন্ন দেশের সামরিক যোগাযোগ, অনলাইন গেমিং এবং লাইভ স্ট্রিমিং পরিষেবা। এর ফলে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির প্রায় এক হাজার কোটি মার্কিন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।
তবে এই হুঁশিয়ারি বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু জটিলতা রয়েছে। প্রথমত, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে মেটা বা মাইক্রোসফটের মতো আমেরিকান সংস্থাগুলোর পক্ষে ইরানের সাথে কোনো আর্থিক লেনদেন করা আইনত অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক টেলিকম গবেষণা সংস্থার মতে, হরমুজ প্রণালীর সব তার ইরানের জলসীমায় নেই; বহু তার ওমানের জলসীমা ব্যবহার করে সতর্কভাবে বিছানো হয়েছে। তবে ‘ফ্যালকন’ এবং ‘গাল্ফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল (জিবিআই)’-এর মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তার ইরানের জলসীমার ভেতরেই রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, ইরান যদি হরমুজের পর লোহিত সাগরেও একই নীতি নেয়, তবে বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন বুঝতে পারছে যে হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের এই ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য কতটা শক্তিশালী একটি অস্ত্র।
