Id Politics and the Census

জীবনযাপন/LIFE STYLE
Spread the love


আদমশুমারির মাধ্যমে জনসংখ্যার অন্তর্লীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে শ্রেণিবদ্ধ করা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এর ফলে আদমশুমারি সাধারণ লোকগণনার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাষ্ট্র কীভাবে তার জনগণকে দেখতে ও পরিচালনা করতে চায়, তার জনগণকে দেখতে ও পরিচালনা করতে চায়, তার ঐতিহাসিক দলিলে রূপান্তরিত হয়। লিখছেন অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

বিজেপি সরকারের অধীনে এটি দ্বিতীয় জনগণনা। ২০০১ সালে প্রথমবার বাজপেয়ী সরকার করেছিল, আর ২৫ বছর পরে ২০২৬ সালে মোদি সরকার এই কাজ করছে। এই ঘটনা বাদ দিলেও বর্তমান জনগণনা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৮৮১ সাল থেকে ২০১১ অবধি প্রতি
১০ বছর অন্তর চলা লোকগণনার যে দীর্ঘ ১৩০ বছরের ধারাবাহিক ইতিহাস ভারতের আছে, সেখানে ২০২১ সালে ছেদ পড়েছিল। ফলস্বরূপ আর-একটি অভাবিতপূর্ব রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক মুহূর্ত সৃষ্টি হয়ে গেল।

আরও পড়ুন:

২০২৬ থেকে ঠিক ৭৫ বছর পিছিয়ে গেলে যে-বর্ষটির মুখোমুখি আমরা দঁাড়াই, সেটি ১৯৫১ সাল। স্বাধীন ভারতের প্রথম লোকগণনার ‘প্ল‌্যাটিনাম জয়ন্তী’-তে যে আরও একটি লোকগণনার কাজ হবে, এমন সমাপতন ছিল একেবারেই অচিন্ত্যপূর্ব। এছাড়াও আরও একটি ভবিষ্যৎ খুব সম্ভবত নির্মাণ করা হল, সেটা এই যে, ১৯৩১ সালে আর কোনও জনগণনার কাজ নাও হতে পারে। কেননা ডিজিটাল ব্যবস্থা হলেও বর্তমান জনগণনার নানাবিধ অ্যাবস্ট্রাক্ট, রিপোর্ট ও তথ্য পরিসংখ্যান প্রকাশ হতে হতেই ২০৩১ চলে আসার কথা, এমনকী পেরিয়েও যেতে পারে। সুতরাং ভারতীয় জনগণনার পর্যায়ক্রম এবার থেকে হয়তো ২০৩৬, ২০৪৬ এইভাবে নির্ধারিত হতে চলেছে। আর যদি ২০৩১ সালে হয়, তবে সেটিও প্রথমবার ৫ বছর পরে হওয়া আদমশুমারি রূপে ইতিহাসের পাতায় নথিভুক্ত হবে।

আরও পড়ুন:

ভারতের জনগণনার উদ্যোগ গ্রহণ শুরু হয়েছিল ১৮৫৬ সালে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের কারণে ১৮৬১ সালে সেটি করা সম্ভবপর হয়নি। ১৮৬৭ থেকে ১৮৭১ অবধি যে আদমশুমারির অসম লয়ে কাজ হয়েছিল, সেটাকেই ১৮৭১ সালের জনগণনা হিসাবে ধরা হয়। এ বছরটিকে মান্যতা দেওয়া হলে ২০২১ সালেই ভারতের জনগণনার ১৫০ বছর পালন করা যেত, কিন্তু তা হয়নি। যৌক্তিকভাবে বিচার করলে তা হওয়ার কথাও নয়। কারণ সেই গণনায় ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণাধীন সমগ্র ভূখণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সেজন্য ১৮৮১ সালের জনগণনাকেই ভারতের সর্বপ্রথম জনগণনার বছর ধরা হয়ে থাকে। সেই হিসাবে, ২০৩১ সালের জনগণনা দেশের ১৫০তম জনগণনা হতে পারত, জনগণনা পিছিয়ে ২০২৬ সালে হওয়ার কারণে, সম্ভবত সেই সুযোগও দেশের হাতছাড়া হয়ে গেল।

‘জনগণনা’ একটি বিরাট, বিপুল কাজ। আদমশুমারি কেবল মানুষ গণনার পরিসংখ্যান নয়, বরং কোন পদ্ধতিতে এই গণনা সম্পাদিত হচ্ছে, সেই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ‘রাষ্ট্র’ আসলে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রের একটি অবয়ব নির্মাণ করে ফেলে। বিশেষ করে ‘এসআইআর’-এর পরে দেশজুড়ে যত বিতর্ক হয়েছে, জল আদালত অবধি এমনভাবে গড়িয়েছে যে, মানুষের মনে জনগণনা নিয়ে রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য বিষয়ে নানাবিধ প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি হয়েছে। ‘সেনসাস আইন ১৯৪৮’ অনুযায়ী মানুষ নিজের তথ্য রাষ্ট্রকে দিতে আইনত বাধ্য এ-কথা ঠিক, তাই বলে মানুষের মনে যে সন্দেহ নিরসন হয়েছে এমনটা নয়।
তবে একইসঙ্গে এও সত্য যে, জনগণনার সঙ্গে চিরকাল রাষ্ট্রের ক্ষমতা, রাজনৈতিক স্বার্থ, এবং সমাজ সম্পর্কে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে যুক্ত ছিল। শাসনের সুবিধার জন্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ে জনগণনা ভারতীয় সমাজকে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি, বর্ণ ও উপজাতির মধ্যে শ্রেণিবদ্ধ করতে শুরু করেছিল। অথচ ব্রিটিশরা নিজেদের দেশে এই ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ও সতর্ক পদক্ষেপ নিয়েছিল। গ্রেট ব্রিটেনের আদমশুমারি-তে ‘জাতিসত্তা’ ১৯৯১ সালে প্রথমবার অন্তর্ভুক্ত করা হয়, আর ২০০১ সালে ধর্মকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ব্রিটিশ মুসলিমদের তরফে চাপ তৈরি হয়। কিন্তু ভারতে বরাবর ধর্ম– সেনসাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে বিদ্যমান ছিল।

যে-কারণে উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ১৯০৯ সালে ‘হিন্দুজ: আ ডাইং রেস’ নামে বই লিখতে পেরেছিলেন। এই বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম বাক্য শুরুই হয় জনগণনার তথ্যকে সামনে রেখে, বলা হয়– ‘১৮৭২ সালে ভারতের প্রথম আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দেখা গিয়েছিল যে, বঙ্গদেশে হিন্দুদের সংখ্যা ছিল ১৭১ লক্ষের সামান্য বেশি এবং মুসলমানদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬৭ লক্ষ। ফলে সংখ্যার দিক থেকে হিন্দুরা মহামেডানদের চেয়ে ৪ লক্ষ বেশি ছিল। পরবর্তী আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৮১ সালে। সেখানে দেখা যায় যে, মহামেডানদের সংখ্যা ১৬৭ লক্ষের সামান্য কম থেকে বেড়ে প্রায় ১৭৯ লক্ষ হয়েছে, যেখানে হিন্দুদের সংখ্যা ১৭১ লক্ষ থেকে বেড়ে দঁাড়িয়েছে মাত্র ১৭২.৫ লক্ষের কাছাকাছি। হিন্দুদের এই সংখ্যাগত
আধিপত্য কেবল হারিয়েই যায়নি, বরং তারা ৬ লক্ষেরও বেশি ব্যবধানে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছিল।’

এই ধারায় পিরদের উদ্দেশ্যে হাঁস-মুরগি বলি দেওয়া হয়, যেটা একেবারেই সনাতনি ধারা।

এরপর তিনি লেখেন– “৩০ বছরের মধ্যে বাংলার মহামেডানদের সংখ্যা ৩৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং হিন্দুদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল প্রায় ১৭ শতাংশ– যেখানে দু’জন মহামেডান ছিল, সেখানে মাত্র একজন হিন্দু ছিল। ১৮৯১ সালে মিস্টার সি. জে. ও’ডোনেল বাংলার আদমশুমারি কমিশনার ছিলেন। তিনি গণনা করে বের করেছিলেন যে, মহামেডানদের বৃদ্ধির হার যদি একইভাবে চলতে থাকে, তবে বাংলা থেকে হিন্দুদের সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হতে কত বছর সময় লাগবে।” এমনকী ১৯৩১ সালে সেনসাস কমিশনার নিজে স্বীকার করেছিলেন যে, ধর্মভিত্তিক জনপরিসংখ্যান সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে উসকে দেওয়া শুধু নয়, দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে।

কথাটি যে পাথুরে সত্যে পরিণত হয়েছে, তা অনস্বীকার্য। পরের জনগণনাতেই অর্থাৎ ১৯৪১ সালে পাঞ্জাব ও বাংলায় হিন্দু ও মুসলিম গণনাকারীদের বিরুদ্ধে একে-অপরকে কম সংখ্যায় গণনা করার অভিযোগ উঠেছিল, যেটা এই কথার আর-একটি ঐতিহাসিক প্রমাণ। কিন্তু ভারতের সমাজ এত ভিন্নতার মধ্যে এত গভীর ঐক্যকে ধরে রেখেছে সে-কথাই মাঝেমধ্যে ভুলে যাওয়া হয়। যেমন ধরুন, পঞ্চপীরিয়া ধারা।

এই ধারায় পিরদের উদ্দেশ্যে হাঁস-মুরগি বলি দেওয়া হয়, যেটা একেবারেই সনাতনি ধারা। কিংবা ধরুন, গুজরাতের ‘মঠীয় কুনবিস’ সম্প্রদায়টির কথা, যেটি ছিল হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের আচারের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। এখানে সনাতন প্রথা অনুযায়ী ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের আমন্ত্রণ জানানো হত, আবার এরা সুফি সন্ত পিরানার ইমাম শাহ এবং তঁার উত্তরসূরিদের একনিষ্ঠ অনুসারীও ছিল। ধর্মীয় সমন্বয়ের আর-একটি জীবন্ত উদাহরণ ‘শেখজাদা’ সম্প্রদায়। এদের বিয়েতে হিন্দু পুরোহিত এবং মুসলিম ধর্মীয় গুরু বা কাজি উভয়েই সমানভাবে অংশ নিতেন। সুতরাং মানুষের সামাজিক মিলমিশের ফলে গড়ে ওঠা ঐক্য যখন সহজে ভাঙা সম্ভব হয় না, তখন শাসক কূট পরিকল্পনা করে, যেমন ব্রিটিশরা করেছিল, আর ভারত স্বাধীন হওয়ার পরেও সেটি থেকে দেশবাসী মুক্তি পায়নি।

১৯৫১ সালের জনগণনায় জাতি ও বর্ণের সাধারণ গণনা সীমাবদ্ধ করা হলেও তফসিলভুক্ত জাতি ও তফসিলভুক্ত উপজাতির মতো সংবিধান-স্বীকৃত বঞ্চিত গোষ্ঠীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। অবশ্য ধর্মের প্রশ্ন বাদ রাখা হয়নি। ১৯৬১ সালে আকারে ক্ষুদ্র ধর্মীয় সম্প্রদায়, যেমন– পারসি, ইহুদি ইত্যাদি এবং কিছু উপজাতীয় ধর্মের পৃথক তথ্য-প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ভারতকে প্রধানত ছ’টি বৃহৎ ধর্মীয় গোষ্ঠীর সমষ্টি রূপে উপস্থাপনের প্রবণতা তৈরি হয়। ১৯৭১ সালের জনগণনায় আবার কেবল ধর্ম নয়, ধর্মভিত্তিক প্রজনন-সংক্রান্ত তথ্যও সংগ্রহ করা হয়, প্রকাশও করা হয়। এর ফলে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সন্তান জন্মদানের হারের পার্থক্য নিয়ে জনমিতিক তুলনা আরও বৃদ্ধি পায়।

জাতি বা বর্ণের রাজনীতিতেও একই ধরনের দ্বন্দ্ব ও টানাপোড়েন পরিলক্ষিত হয়। একদিকে, নিম্নবর্ণ এবং সামাজিকভাবে বঞ্চিত অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে জাতিভিত্তিক তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপন্ন হয়, কারণ এর সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচার, সমান প্রতিনিধিত্ব এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম বণ্টনের অধিকারের মতো বিষয় জড়িত থাকে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এই জাতিগত গণনা এক বৃহত্তর রাজনৈতিক মেরুকরণ বা নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, ভোট রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। সেজন্যই তো ২০০১ সালের আদমশুমারিতে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) জন্য সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়টিতে বাজপেয়ী সরকারের অনমনীয় মনোভাব দেখা গিয়েছিল।
একইসঙ্গে ধর্মের ব্যাপারে ১৯০৯ সালের প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল আবার, প্রায় ৯২ বছর পরে। ২০০১ সালের আদমশুমারির পর সংঘ পরিবার মুসলিম জনসংখ্যার তথাকথিত ‘বিস্ফোরক বৃদ্ধি’-র তত্ত্ব প্রচার করে একে উচ্চপ্রজনন হারের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। অথচ, প্রকৃত জনমিতিক সত্যটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি কেবল সন্তান জন্মদানের হারের উপর নির্ভর করে না, বরং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়া এই বৃদ্ধির নেপথ্যের অন্যতম প্রধান ছিল।

আদমশুমারির মাধ্যমে জনসংখ্যার অন্তর্লীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে শ্রেণিবদ্ধ করা রাষ্ট্রের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প।

সুতরাং ভারতের জনগণনা কেবল জনসংখ্যা গণনার প্রক্রিয়া নয়, এটি সামাজিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার পারস্পরিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠাও বটে। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে আত্মপরিচয় বা ‘আইডেনটিটি’ ক্রমশ রাজনৈতিক দলবদ্ধতার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলি ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে।

এই প্রেক্ষাপটে, আদমশুমারির মাধ্যমে জনসংখ্যার অন্তর্লীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে শ্রেণিবদ্ধ করা রাষ্ট্রের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এর ফলে আদমশুমারি সাধারণ লোকগণনার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাষ্ট্র কীভাবে তার জনগণকে দেখতে ও পরিচালনা করতে চায়, তার এক ঐতিহাসিক দলিলে রূপান্তরিত হয়। বিশেষ করে ঔপনিবেশিক আমলে এই শুমারির হাত ধরেই হিন্দু ও মুসলিম জনসংখ্যার সংখ্যাগত তুলনার বিষয়টি সামনে আসে এবং ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’ ও ‘সংখ্যালঘু’-র ধারণাটি জনমিতিক সংখ্যার আধিপত্যের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে। দেশ বিভক্ত হয়, ব্রিটিশের শাসন দীর্ঘায়িত হয়, দেশভাগ পর্যন্ত হয়। সুতরাং, এখনও যে এই সংখ্যাকে রাজনৈতিক অস্ত্র রূপে ব্যবহার করে, হিন্দুদের ভিতরের জাতিভেদ, উপসম্প্রদায় এবং শ্রেণিগত অভ্যন্তরীণ সমস্ত বৈচিত্র ও বিভেদকে আড়াল করে, তাদের একটি একক ও অখণ্ড ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসাবে গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী প্রবণতা তৈরি করবে না, তা দাবি করা তো যায় না।
অধিকন্তু ২০২৬ সালের সময়সীমা পার হওয়ার পর অনুষ্ঠিতব্য প্রথম আদমশুমারির পরিসংখ্যানকে ভিত্তি করেই তো সারা দেশের নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারিত হওয়ার আইনি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এর ফলে, কোন অঞ্চলের জনসংখ্যা কেমন বাড়ছে বা কমছে এবং তার ভিত্তিতে কোন রাজ্যের সংসদীয় আসন সংখ্যা কতটা পরিবর্তিত হবে, সেটাও দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। আসন বিন্যাসের এই সুদূরপ্রসারী সমীকরণের কারণে সমকালীন রাজনীতিতে এই আদমশুমারির গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতা আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে যে-কথাটি না বললেই নয়, তা হল: ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সৌজন্যে হালে অনেক কিছুরই পূর্বাভাস পেয়ে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়েছে। জনগণনার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য।

বিশেষ করে, দিল্লির জুলাই আন্দোলনের পরে দেশে যখন বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে জনমানুষের ক্ষোভ নানাভাবে নানা দিক থেকে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েই চলেছে, তখন ২০২৯ সালের নির্বাচনের আগে এই জনগণনার ভূমিকা অপরিসীম। হালে নির্বাচনী পূর্বাভাস বা ‘ইলেকশন প্রেডিকশন’-কে সাধারণত এমন একটি পরিসংখ্যানগত ও কম্পিউটেশনাল প্রক্রিয়া রূপে বিবেচনা করা হয়, যা সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্যের উপর ভিত্তি করে কাজ করে। এই প্রক্রিয়ায় অতীতের বিভিন্ন নির্বাচন, জনমিতিক বৈশিষ্ট্য, বর্তমান আর্থনীতিক পরিস্থিতি, জনমত সমীক্ষা বা ‘ওপিনিয়ন পোল’, ভৌগোলিক তথ্য এবং ক্ষেত্রবিশেষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের কোনও নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল অনুমান বা প্রেডিক্ট করা হয়। সাধারণত দেশব্যাপী পরিচালিত জনমত সমীক্ষাগুলির নমুনা বা ‘স্যাম্পল সাইজ’ ছোট হওয়ার কারণে, প্রতিটি নির্দিষ্ট বা ক্ষুদ্র নির্বাচনী এলাকার জনমত নিখুঁতভাবে জানা সম্ভব হয় না। এইখানে আদমশুমারির তথ্য একটি অপরিহার্য চালিকাশক্তি রূপে কাজ করতে পারে। ‘মাল্টিলেভেল রিগ্রেশন অ্যান্ড পোস্ট-স্ট্র্যাটিফিকেশন মডেল’ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আসন্ন নির্বাচনে এই তথ্য যে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হবে না–এমনটা জোরের সঙ্গে দাবি করা অসম্ভব।

প্রথম ধাপে দেশব্যাপী সংগৃহীত সীমিত জনমত সমীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে ভোটারদের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য (যেমন: বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা ও জাতি) এবং তঁাদের ভৌগোলিক অবস্থানের (যেমন—রাজ্য বা জেলা) মধ্যে একটি গাণিতিক সম্পর্ক তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে মডেলটি নির্ধারণ করে যে, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের এবং নির্দিষ্ট সামাজিক পটভূমির একজন ভোটারের কোনও একটি রাজনৈতিক দলকে ভোট দেওয়ার গাণিতিক সম্ভাবনা কতটুকু। তারপর দেশের জাতীয় আদমশুমারির সামষ্টিক তথ্য ব্যবহার করে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার সমগ্র জনসংখ্যাকে বয়স, লিঙ্গ ও জাতিভিত্তিক শত শত ছোট ছোট স্তরে বা ‘কোষে’ বিভক্ত করা হয়। পরিশেষে, রিগ্রেশন মডেল থেকে প্রাপ্ত ‘ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা’-কে জনগণনা থেকে প্রাপ্ত ‘সেই এলাকার বাস্তব জনসংখ্যার অনুপাত’ দিয়ে গুণ করে প্রতিটি আসনের চূড়ান্ত ফলাফল একত্রীকরণ করা যায়। এই সমন্বিত প্রযুক্তির ফলেই দেশজুড়ে সীমিত স্যাম্পল থাকা সত্ত্বেও, প্রতিটি আসনের জন্য অত্যন্ত নির্ভুল ও আসনভিত্তিক নির্বাচনী পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

সুতরাং, আসন্ন নির্বাচনে এই তথ্য যে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হবে না–এমনটা জোরের সঙ্গে দাবি করা অসম্ভব। তবে মনে পড়ে, অমূল্যরত্ন নন্দা-র কথা, যিনি ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ভারতের জনগণনা কমিশনার ছিলেন, একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, জনগণনার তথ্য যে-আইনে সংগ্রহ করা হয়, সেই আইনেই এর গোপনতা রক্ষা করার অঙ্গীকার নেওয়া হয়, উল্টোদিকে নির্বাচন চলে সম্পূর্ণ অন্য একটি আইনের দ্বারা। তিনি যখন কমিশনার ছিলেন– ১৯৯১ সালের জনগণনার তথ্য তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার টি. এন. সেশন চেয়ে পাঠিয়েছিলেন, এবং না পাওয়ায় নন্দার উপরে খুব হম্বিতম্বি করেছিলেন, কিন্তু নন্দা কিছুতেই তথ্য হাতছাড়া করেননি।

২০২১ সালের প্রস্তাবিত জনগণনার আগে ২০১৯ সালে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) পাস করা হয়।

এখনও দেশে নৈতিকতা টিকে আছে, এবং বর্তমান জনগণনার তথ্যও সুরক্ষিত থাকবে ও কোনওরকম অসাধু উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে না। এই বিশ্বাসটুকু জনমনে জাগানোর দায়িত্ব দেশের শীর্ষমহলকেই নিতে হবে। তবেই এই কাজে দেশের মানুষ নির্ভয়ে অংশগ্রহণ করে একটি ঐতিহাসিক নজির তৈরি করবে– ভারত হবে পৃথিবীর সবথেকে জনবহুল দেশ।

পুনশ্চ ২০১১ সালের জনগণনায় ভারতের ‘স্বাভাবিক’ বাসিন্দাদের তালিকা (এনপিআর) তৈরির চেষ্টা হলেও, তার ভিত্তিতে ‘নাগরিকদের জাতীয় পঞ্জি’ (এনআরসি) গঠন এবং প্রত্যেককে ‘অনন্য পরিচয়পত্র’ (ইউআইডি) দেওয়ার পরিকল্পনা তখন সফল হয়নি। পরবর্তীতে, ২০২১ সালের প্রস্তাবিত জনগণনার আগে ২০১৯ সালে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) পাস করা হয়।

কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে আমার সমস্ত মাস্টারমশাই এবং বিশেষ করে আর. বি. ভগৎ-কে, যঁাদের প্রতিটি ক্লাসে জনবিজ্ঞান বিষয়ে খুঁটিনাটি জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ পেয়েছিলাম।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক শিক্ষক
[email protected]

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *