প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: শারদোৎসবে যখন চারিদিকে আনন্দের জোয়ার, তখন সেই আনন্দের আবহ থেকে বহু দূরে এক গভীর শোক গ্রাস করেছে আদিবাসী সমাজকে। বর্ণহিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন মহা আনন্দের হলেও, অসুর জনজাতির কাছে এই সময়টি মূলত এক পরম শোকের ঋতু। কারণ তাঁদের লোকবিশ্বাস ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তিত্ব হলেন তাঁদের নিজস্ব দেবতা ‘হুদুড় দুর্গা’ (Hudur Durga), অর্থাৎ মহিষাসুর। নিজেদের এই অনার্য দেবতার স্মরণে ও তাঁর সন্ধানেই দুর্গোৎসবের দিনগুলিতে বুকভরা বিষাদ নিয়ে ছদ্মবেশে মেতে ওঠেন পূর্ব বর্ধমান (Purba Burdwan) সহ সমগ্র অঞ্চলের আদিবাসী মানুষজন।
আদিবাসী সমাজের অনেকেই নিজেদের মহিষাসুরের বংশধর বলে মনে করেন। সর্বশেষ জনগণনার পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে এখনও অস্তিত্ব বজায় রাখা ‘অসুর জনজাতি’র মানুষরাই মূলত মহিষাসুরের পুজো করে থাকেন। তাঁদের লৌকিক বিশ্বাস অনুযায়ী, “দুর্গা আসলে কোন নারী শক্তি নয়। দুর্গা হলেন শক্তিশালী বলবান পুরুষ”। সাঁওতালি ভাষায় ‘হুদুড়’ শব্দের মূল অর্থ হলো প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে আসা বাতাস। তাঁদের লোকগাথা বলে, অনার্যদের এই পরাক্রমশালী নেতা মহিষাসুর বা হুদুড় দুর্গাকে সরাসরি যুদ্ধে পরাজিত করতে না পেরে আর্য সেনাপতি ইন্দ্র ছলনার আশ্রয় নিয়েছিলেন। এক দেবীকে ছদ্মবেশে পাঠানো হয়, যিনি হুদুড় দুর্গাকে বিবাহ করার পর নবমীর দিনে তাঁকে হত্যা করেন। আদিবাসীদের মতে, যুদ্ধে নারী বা শিশুদের আঘাত না করার নীতিতে অবিচল থাকা এবং অনার্যদের এই মানবিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই দেবী তাঁকে পরাজিত করেছিলেন।
এই দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরেই প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শেষভাগ থেকে অনুশীলনের পর মহাষষ্ঠীর দিন থেকে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী ‘দাসাই পরব’। দশমী পর্যন্ত চলা এই পরবে আদিবাসী পুরুষরা নারীদের পোশাক পরিধান করে, মাথায় ময়ূরের পালক গুঁজে এবং হাতে ধামসা, মাদল ও ‘ভুয়াং’ বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে বুক চাপড়ে বিষাদের গান গান। এই ছদ্মবেশ ধারণ করার মূল লক্ষ্যই হলো নিজেদের হারিয়ে যাওয়া অনার্য ভগবান হুদুড় দুর্গাকে খুঁজে বেড়ানো। শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রথা ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে তাঁরা আজও তাঁদের ইতিহাস, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বকীয় অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

