Hispid Hare | গরুমারা থেকে বিলুপ্তির পথে বিরল খাগরি খরগোশ, চিন্তায় বন দপ্তর

Hispid Hare | গরুমারা থেকে বিলুপ্তির পথে বিরল খাগরি খরগোশ, চিন্তায় বন দপ্তর

শিক্ষা
Spread the love


শুভদীপ শর্মা, লাটাগুড়ি: বর্ষায় ভয়াবহ প্লাবন, চৈত্রের শেষদিকে জঙ্গলে একাধিকবার আগুন লাগা। সেইসঙ্গে চোরাশিকার। এই তিনের কোপে গরুমারা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে হিসপিড হেয়ার বা খাগরি খরগোশ (Hispid Hare)। একসময় এদের অন্যতম বাসভূমি ছিল গরুমারার (Gorumara) তৃণভূমি। বছরের পর বছর ধরে জলঢাকা ও মূর্তি নদীর সংযোগস্থলের পার্শ্ববর্তী সেই তৃণভূমি প্লাবনের পলিতে ঢাকা পড়েছে। আবার জঙ্গলের ওই এলাকাতেই চৈত্র শেষে দাবানল লেগেছে কয়েকবার। তৃণভূমির ঘাসের আড়ালে থাকা হিসপিড হেয়ার তাই গরুমারায় আর দেখাই যাচ্ছে না।

হিসপিড হেয়ারের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যাপ্রোলাগাস হিসপিডাস। মাথা থেকে শরীরের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৪০ থেকে ৫৪ সেন্টিমিটার। শরীরের উপরের অংশের লোম অত্যন্ত খসখসে ও শক্ত। পিঠ কালো ও বাদামি লোমের মিশ্রণে গাঢ় বাদামি এবং পেটের অংশ সাদাটে বা হালকা বাদামি রঙের। লম্বা ঘাসে ঢাকা তৃণভূমিই এদের সবচেয়ে উপযোগী আবাসস্থল। অত্যন্ত লাজুক স্বভাবের হওয়ায় দিনের বেশিরভাগ সময় ঘাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। রাতের অন্ধকারে খাবারের সন্ধানে বের হয়। একসময় উত্তরবঙ্গের জলদাপাড়া ও গরুমারা জাতীয় উদ্যানের বিস্তীর্ণ ঘাসবন এই বিরল খরগোশের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত ছিল।

বন দপ্তরের প্রবীণ আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, গরুমারার গরাতি নামক ওই এলাকার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে একসময় সবচেয়ে বেশি হিসপিড হেয়ারের দেখা মিলত। কিন্তু প্রতিবছর বর্ষায় প্রবল প্লাবনে সেই ঘাসবন পলিতে ঢেকে গিয়ে ধীরে ধীরে তৃণভূমির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সেই বিপর্যয় আরও প্রকট হয়েছে। ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর জলঢাকা নদীর ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে গরুমারার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। অসংখ্য ছোট-বড় প্রাণীর মৃত্যু হয়। বনকর্মীদের মতে, এমন প্রবল প্লাবনের ধাক্কায় তৃণভূমিতে বসবাসকারী হিসপিড হেয়ারের মতো ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের অস্তিত্বও মারাত্মক বিপন্ন হয়েছে।

অন্যদিকে, শীতের শেষে ও চৈত্র মাসে একাধিকবার দাবানলে পুড়ে যায় শুকনো ঘাসের বিস্তীর্ণ এলাকা। ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল গরুমারার মেদলা নজরমিনার সংলগ্ন বুধুরাম বিটের ঘাসবনে বড় ধরনের আগুন লাগে। সেই আগুনে গরুমারার বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বহু বন্যপ্রাণীর মৃত্যুও হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তৃণভূমির উপর নির্ভরশীল হিসপিড হেয়ারের মতো প্রাণীর জন্য এ ধরনের দাবানল অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে খাদ্য, আশ্রয় এবং প্রজননের উপযোগী পরিবেশ একসঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায়।

চোরাশিকারের ঘটনাও এই বিরল প্রাণীর অস্তিত্বের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। প্রাক্তন বনাধিকারিক তাপস দাস বলেন, ‘অতীতে গরুমারায় হিসপিড হেয়ারের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আর প্রাণীটির দেখা মেলেনি। বর্তমানে এদের সংখ্যা কত, কোথায় রয়েছে বা আদৌ স্থায়ীভাবে টিকে আছে কি না, সে বিষয়ে বন দপ্তরের কাছেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।’

২০১৩ সালে ভারতের প্রাণী বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা সংস্থা (জেডএসআই)-র উদ্যোগে গরুমারায় তিনদিন ধরে হিসপিড হেয়ারের সন্ধানে সমীক্ষা চালানো হয়। সমীক্ষক দলের অন্যতম সদস্য বিজ্ঞানী কৌশিক দেওটি জানান, গরুমারায় এখনও প্রাণীটির অস্তিত্বের প্রমাণ মিলবে বলেই তাঁরা আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু সম্ভাব্য সমস্ত এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়েও প্রাণীটির দেখা মেলেনি। সেই সমীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত বনাধিকারিক বাদল দেবনাথ। তাঁর কথায়, সম্ভাব্য প্রতিটি ঘাসবনেই সমীক্ষক দলকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত হতাশ হয়েই ফিরতে হয়।

গরুমারার এক প্রবীণ বনকর্মী জানান, গরুমারার ঘাসবনে একসময় একাধিক প্রজাতির খরগোশের বাস ছিল। হিসপিড হেয়ারেরও দেখা মিলত নিয়মিত। কিন্তু বহু বছর ধরে আর এই বিরল খরগোশের দেখা মেলেনি। বিশিষ্ট পরিবেশপ্রেমী অনিমেষ বসুর মন্তব্য, ‘হিসপিড হেয়ারের পাশাপাশি গরুমারা থেকে পিগমি হগও হারিয়ে গিয়েছে। পিগমি হগকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বন দপ্তর একাধিকবার উদ্যোগ নিলেও হিসপিড হেয়ারের সংরক্ষণ বা পুনরুদ্ধারে তেমন উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ এখনও চোখে পড়েনি।’

তবে আশার আলো এখনও নিভে যায়নি। বন দপ্তর সূত্রে খবর, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন বনকর্মী রাতে টহলদারির সময় হিসপিড হেয়ারের মতো একটি প্রাণী দেখতে পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন। যদিও এখনও পর্যন্ত তার কোনও ছবি মেলেনি। গরুমারার এডিএফও রাজীব দে জানান, বনকর্মীরা প্রাণীটিকে দেখার দাবি করলেও ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, গরুমারার তৃণভূমি সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হলে প্রাণীটির দেখা মিলতেও পারে। বন মহলের আশা, বহুদিন আড়ালে থাকার পর একদিন হয়তো আবারও গরুমারার ঘাসবনে দেখা মিলবে এই দুর্লভ খরগোশের।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *