যে-মানুষটিকে নিয়ে এই লেখা, তিনি ৯৬ বছর বয়সে, এই বছরের ১৪ মার্চ, আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। ১৯২৯ সালে শুরু হওয়া জীবনের অবসান পর্যন্ত তাঁর মনন ছিল জাগ্রত, এবং তাঁর আলোকনের দর্শন ছিল অক্লান্ত। তাঁর জীবনদর্শন, সমাজভাবনা, রাজনৈতিক মনন, এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ, কমিউনিকেশন, এবং সেই সূত্রে তাঁর ভাষাদর্শন– এসব ক্রমাগত নব-নব পরতে ও ব্যাখ্যায় উন্মোচিত হতেই থাকবে। নতুন-নতুন ছাঁকনিতে ছাঁকা হতে থাকবে তাঁর প্রসারিত দার্শনিক প্রভাব, তাঁর আন্তর্জাতিক ইন্টেলেকচুয়াল অবদানের সারাৎসার।
সত্যি কথাটি হল, ইয়ুরগেন হাবারমাস এমনই এক জার্মান দার্শনিক, যাঁর শেষ নাহি যে শেষকথা কে বলবে! এবং আরও আশ্চর্যের কথা, বুঝিলাম নাহি বুঝিলাম, তাঁর প্রভাব এবং আলোকন থেকে আধুনিকতার মুক্তি নেই।
আরও পড়ুন:
এই ‘মুক্তি’ শব্দটি তাঁকে নিয়ে চর্চার চাবিশব্দ। তিনি আজীবন সন্ধানী সেই গণতন্ত্রের, যে-গণতন্ত্র শুধু ভোটনির্ভর নয়, যে-গণতন্ত্রের তিনি নাম দিয়েছেন, ‘ডেলিবারেটিভ ডেমোক্রেসি’। যে-গণতন্ত্র গড়ে তুলবে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ বা কমিউনিকেশনের যুক্তিনিষ্ঠ আলোচনা, খোলাখুলি মত আদানপ্রদান ও মুক্ত সংলাপের অবাধ পরিসর।
আরও পড়ুন:
বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক মঞ্চ থেকে কফি হাউস পর্যন্ত। অবাধ আলোচনার জায়গা সর্বত্র। অর্থহীন খোশগল্প, অলস আড্ডাকে হাবারমাস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছেন এই আলোচনায়।
কোনও ভাবনাই শেষ ভাবনা নয়। সমস্ত ভাবনার যুক্তিগ্রাহ্য বিপরীত ভাবনা থাকতেই পারে– এই সত্যকে যেন মর্যাদা দিতে পারি আমরা, এই সহিষ্ণু সংস্কৃতি ও দর্শনের পৌরোহিত্য করেছেন হাবারমাস তাঁর একের-পর-এক সমাজ ও জীবনবান্ধব লেখায়, বারবার বলেছেন তঁার দর্শনের এই কেন্দ্রীয় কথা: ‘Solely these norms are legitimate that meet with the approval of all affected in sensible discourse’. এ ভাবনাই তঁাকে পৌঁছে দিয়েছে তঁার বিখ্যাত ‘ডিসকোর্স প্রিসিপল’-এ।
এ কথা মনে রাখা খুব জরুরি যে, হাবারমাস জন্মেছিলেন হিটলারের জার্মানিতে। এবং তাঁর শৈশবের শিক্ষা প্রভাবিত হয়েছিল বাধ্যতামূলক হিটলারি দীক্ষায়, দর্শনে, আদর্শে। ১৬ বছর বয়সে তাঁকে বন্দুক ধরতে হয়েছিল ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই নির্মম স্মৃতি, সেই বেদনা ও আর্তির উপত্যকা তাঁকে ‘হন্ট’ করেছে সারা জীবন, আমৃত্যু। এবং তাঁর দর্শনকে করে তুলেছে মানববন্ধনের সন্ধানী, মানুষের সঙ্গে মানুষের বোঝাপড়া এবং হিংসাহীন সম্পর্কের পূতঃমন্ত্র। যে-মন্ত্র উঠে এসেছে ‘ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল’-এ (১৯৪৫-’৪৬) নাৎসি অত্যাচার ও বিকৃত অপরাধের কথা জেনে তাঁর অবিরাম মনবেদনা ও যাতনা থেকে। এই যন্ত্রণা এবং এক ধরনের অপরাধবোধ তাঁর মধ্যে আরও তীব্র হয়ে উঠতে লাগল, যখন তিনি ক্রমে আবিষ্কার ও অনুভব করতে শুরু করলেন, যে-জার্মান দার্শনিকদের তিনি গুরুর আসনে বসিয়েছেন, তাঁরাও নাৎসি-ভাবনা ও প্রত্যয়ের সঙ্গে কোনও-না-কোনওভাবে জড়িয়েছিলেন। এবং তাঁদের লেখায় আপাত আলোর মধ্যে অন্তরস্রোত হয়ে প্রবাহিত নাৎসি
দর্শনের অন্ধকার।

এহেন উপলব্ধির পরে যেন নতুন জন্ম ঘটল হাবারমাসের। তিনি হয়ে উঠলেন প্রতিবাদের এবং একেবারে নব ধারার দার্শনিক চিন্তনের ধারক ও বাহক: সারা বিশ্বের প্রথম সারির ‘পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল।’ একটি লেখায় তিনি ঘোষণা করলেন এই হাড় হিম করা অমোঘ সত্য: ‘Unexpectedly we noticed that we had been residing in a politically legal system’. ১৯৬২ সালে তঁার লেখা ‘The Structural Transformation of the Public Sphere’, যে বিস্ফোরক বই ইংরেজি অনুবাদে সম্ভবত আমাদের হাতে পৌঁছেছিল ১৯৯৪-’৯৫ সালে, যে-বইয়ে তিনি স্বপ্ন দেখছেন এমন একটি শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার যেখানে সমস্ত নাগরিক যোগ দিতে পারবে সমাজ ও শাসনব্যবস্থার খোলামেলা আলোচনায়। এই আলোচনার পরিসর কোথায় কোথায় বিস্তৃত হতে পারে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক মঞ্চ থেকে কফি হাউস পর্যন্ত। অবাধ আলোচনার জায়গা সর্বত্র। অর্থহীন খোশগল্প, অলস আড্ডাকে হাবারমাস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছেন এই আলোচনায়। সমস্তরকম পরচর্চাকেও তাড়িয়েছেন। তাহলে রইল কি বিষয় রূপে? ব্যক্তিস্বার্থহীন, বাণিজ্যবিহীন আলোচনা!
এই ম্যাপ ও মানের প্রচার পরিসর কি চেয়েছেন হাবারমাস তাঁর ‘দ্য স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফরমেশন অফ দ্য পাবলিক স্ফিয়ার’ (১৯৬২) এবং ‘দ্য কমিউনিকেটিভ অ্যাকশন’ তত্ত্বে?
আমার এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে ১৯৬২-’৬৩ সালে কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউস। উপরে ‘হাউস অফ লর্ডস’। নিচে ‘হাউস অফ কমনস’। উপরে– সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, পরিতোষ সেন, অম্লান দত্ত, কিটি স্কুলার (পরে অম্লানকে বিয়ে করে ‘কিটি দত্ত’)। নিচে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অপর্ণা সেন, নবনীতা দেবসেন, গায়ত্রী চক্রবর্তী, তুষার রায়, বিনয় মজুমদার। এটুকু বলতে পারি, কোনও টেবিলের কোনও আলোচনায় ছিল না স্বার্থের ছক।
আমি সেই তুমুল সংলাপ স্বর্গে কফি পান করেছি দিনের পর দিন। কখনও কখনও উপরের বারান্দার এক কোণে ‘এক্ষণ’ পত্রিকায় মগ্ন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দেখেছি অপলক মুগ্ধতায়। আমার তো মনে হয়, সেই সময়ের কলকাতার এই উজ্জ্বল কফি হাউসচক্রে একটিবার যদি আসতেন ভাষার বেড়া পেরিয়ে হাবারমাস, মায়ায় পড়তেন, আটকে যেতেন। আমাদের কফি হাউসের সেই চরিত্র আর নেই। খোলনলচে বদলে গিয়েছে। উমবের্তো ইকো ‘ক্রনিকল্স অফ আ লিকুইড সোসাইটি’-তে (২০১৭) বলেছেন– কীভাবে আধুনিক তারল্য একাকার করে দেবে ক্যাফে থেকে ইউটিউব লাইভ থেকে হ্যাশট্যাগ থেকে পরনিন্দা, পরিচর্চা, ট্রোল, এবং অর্থহীন, বোধশূন্য, মূর্খ আত্মপ্রচারকে।
এই ম্যাপ ও মানের প্রচার পরিসর কি চেয়েছেন হাবারমাস তাঁর ‘দ্য স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফরমেশন অফ দ্য পাবলিক স্ফিয়ার’ (১৯৬২) এবং ‘দ্য কমিউনিকেটিভ অ্যাকশন’ তত্ত্বে? এ দুইয়ের সারমর্ম: ‘কমিউনিকেটিভ র্যাশনালিটি’। অর্থাৎ ভাষার মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ও সম্পর্ক। কোনও জোর নেই। জবরদস্তি নেই। আবার আবেগের নাটকীয়তা বা সুড়সুড়ি নেই। কোনও দিক থেকে নেই কোনও ক্ষমতা প্রয়োগের প্রচেষ্টা। শুধুমাত্র, ‘কনসেসসাস থ্রু ডায়ালগ’।
এ-ই হচ্ছে হাবারমাসের ডিসকোর্স এথিক্স। পাশাপাশি রাখুন, আমাদের সদ্য দেখা গণতান্ত্রিক ভোটের অবয়ব এবং প্রকাশভঙ্গি, মুখের ও শরীরের ভাষা। হাবারমাসের বিষাদবাক্য ‘Enlightenment stays an unfinished challenge’ এরই মাঝে তেতো ঝুমঝুমির
মতো বাজে। আলোকনের প্রচেষ্টা থেকে গেল অসমাপ্ত!
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
