Gangarampur | ভোট আসে ভোট যায়, শীতঘুম কাটে না! গঙ্গারামপুর কি শুধুই দলবদলুদের স্বর্গরাজ্য?

Gangarampur | ভোট আসে ভোট যায়, শীতঘুম কাটে না! গঙ্গারামপুর কি শুধুই দলবদলুদের স্বর্গরাজ্য?

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


পঙ্কজ মহন্ত ও রাজু হালদার, গঙ্গারামপুর: শহরের ব্যস্ততা আছে, রাজনীতি আছে। তবু গঙ্গারামপুর (Gangarampur) যেন এক অদ্ভুত ঘুমে আচ্ছন্ন। গোটা বিধানসভা কেন্দ্রের গায়ে লেগে আছে এক গভীর স্থবিরতা। কেউ এই ঘুম ভাঙাতে এগিয়ে আসেনি কখনও। না নেতা, না প্রশাসন, না সাধারণ মানুষ।

এই ছবিটাই স্পষ্ট হয় বাণগড়ে দাঁড়ালে (Bangarh Fort)। গঙ্গারামপুর বললেই যার নাম আসে, সেই ঐতিহাসিক ঢিপির সামনে বড় বোর্ড লাগিয়েছে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া। কিন্তু বোর্ডই যেন প্রমাণ উদাসীনতার। ইংরেজিতে লেখা ‘Excavation led by K.G. Goswami’, আর বাংলায় তার হাস্যকর অনুবাদ—‘কেজি দ্বারা পরিচালিত খনন গোস্বামী’। যেনতেনপ্রকারেণ দায় সেরে ফেলা কাজ। ঢিপির ওপর আড্ডায় মশগুল কলেজ পড়ুয়া সঞ্জয় হালদারের ক্ষোভ স্পষ্ট, ‘এক বছর আগে বাণগড় ফোর্ট উন্নয়ন ও সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প-এর বোর্ড ঝুলিয়েছিলেন বিধায়ক সত্যেন্দ্রনাথ রায় ও কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। বাস্তবে শুধু একটুখানি প্রাচীর হয়েছে। উন্নয়নের ছিটেফোঁটাও নেই। আর পর্যটনের ব্যবস্থা করা তো দূর অস্ত।’

ঘুমের কথা হচ্ছিল না? সেই বাণগড়ের ঐতিহাসিক ঢিপি থেকে ফেরার পথে চোখে পড়ল তালাবন্ধ রবীন্দ্র ভবন। প্রায় হাজার আসনের সেই ভবন উদ্বোধনের পরেই কার্যত শীতঘুমে। ধলদিঘি রোডে শাহ আতার দরগার সামনেও একই চিত্র। মাদ্রাসা শিক্ষার সূতিকাঘর হিসেবে পরিচিত এই স্থাপত্য আজ অবহেলায় ক্ষয়িষ্ণু। এএসআই বোর্ড টাঙানো কেবল। তাছাড়া আর কোনও উদ্যোগ নেই। স্থানীয় বাসিন্দা মেহেবুব সরকারের আক্ষেপ, ‘রক্ষণাবেক্ষণ হলে পর্যটন বাড়ত, এলাকার অর্থনীতি চাঙ্গা হত।’

কালদিঘি থেকে নয়াবাজারের পথে দমদমা গ্রামের ভাঙাচোরা রাস্তা জনজীবনের নিত্য সমস্যা। নয়াবাজারে ঢুকলেই ভেসে আসে ক্ষীরদইয়ের গন্ধ, যার খ্যাতি গোটা বাংলায়। কিন্তু সেই শিল্পও ধুঁকছে। কারিগর কালী ঘোষের কথায়, ‘সরকারি সহায়তা না থাকায় বড় বড় বাজারে আমাদের মাল পৌঁছেই দিতে পারি না। আমাদের নেতা-মন্ত্রীদের সেসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই।’ একই হাল একসময়কার প্রসিদ্ধ তাঁতশিল্পেরও। বোড়ডাঙ্গির তাঁতশিল্পী আনন্দ সরকারের অভিযোগ, ‘মেশিনে তৈরি কলের শাড়ির দাপটে হারাচ্ছে হাতের কাজের মূল্য। ভোটের আগে নেতারা প্রতিশ্রুতি দিলেও কাজ হয় না।’

অভিযোগের তালিকাটা অনেক দীর্ঘ। গঙ্গারামপুর মহকুমা হাসপাতালের মর্গ ১৬ বছরেও চালু হয়নি, ১৬ লক্ষ টাকার প্রকল্প থমকে। আজও ময়নাতদন্তের জন্য ছুটতে হয় বালুরঘাটে। কোটি টাকার একাধিক কমিউনিটি হল চলে যাচ্ছে ক্লাবের হাতে। কাজের কাজ কিছু হয় না। দশ বছর আগে শহরে বসানো ৪৭টি জলের ট্যাংক আজ অচল। মাঝারি, ক্ষুদ্র ও কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেয়নি রাজ্য থেকে কেন্দ্র। এখানকার আট থেকে দশ হাজার মৎস্যজীবীদের দিকে ফিরেও তাকায়নি কেউ।

রাজনীতির ছবিটাও এই সামগ্রিক অচলাবস্থারই প্রতিফলন। একসময় সিপিএমের শক্ত ঘাঁটি ছিল গঙ্গারামপুর। প্রাক্তন মন্ত্রী, প্রয়াত নারায়ণ বিশ্বাসের হাত ধরে নিশ্চিন্তে জিতে আসা যেত এখান থেকে। এখন কিন্তু চৌপথির ধারে সিপিএমের এরিয়া অফিসে ঢুকলেই চোখে পড়বে অন্য ছবি। ভোটের মরশুমেও দুপুরে খাঁখাঁ করছে ফাঁকা ঘর। কাঠের বেঞ্চের ওপর এক সদস্য টানটান হয়ে শুয়ে রয়েছেন।

নিউ মার্কেটে তৃণমূলের ঝাঁ চকচকে জেলা অফিসে ভিড়ের অন্দরেই ঘুরপাক খাচ্ছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ছায়া। প্রার্থী গৌতম দাসকে ঘিরে বিরোধী গোষ্ঠীর ‘চোরাস্রোত’ নিয়ে সজাগ সকলে। ২০১৬ সালে বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী হয়ে জিতে তৃণমূলে যোগ দেন। পরে জেলা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান। ’২১-এর বিধানসভা ভোটে পরাজয়। তখন সেই হারের জন্য দায়ী করা হয়েছিল মন্ত্রী বিপ্লবের গোষ্ঠীকেই।

বিজেপির ক্ষেত্রেও ছবিটা আলাদা নয়। ২০১১ সালের তৃণমূল বিধায়ক সত্যেন্দ্রনাথ রায় ২০১৬ সালে ভোটে দাঁড়িয়ে পরাজিত হন। সেখানেও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের অভিযোগ ওঠে। পরে দল বদলে বিজেপিতে যোগ দিয়ে জিতে বিধায়ক হন তিনি। এখন ভোটের মুখে তাঁর ‘রিপোর্ট কার্ড’ বিলিতে ব্যস্ত কর্মীরা। দুই প্রার্থীর একবার এই ফুলে, আরেকবার ওই ফুলের মধু খাওয়ার রাজনৈতিক যাত্রাপথ যতটা দলবদলের রংয়ে রঙিন, গঙ্গারামপুরের উন্নয়ন ঠিক ততটাই ফ্যাকাশে।

এই সমীকরণের মাঝেই গত বিধানসভায় ভোটে গঙ্গারামপুরবাসী দলবদলুদের মধ্যে থেকে একজনকে বেছে নিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে এবার সেই বাইনারি ভাঙার চেষ্টা করছে বামেরা। ছাত্র থেকে শিক্ষক সংগঠন হয়ে উঠে আসা নেতা বিপ্লব বর্মনকে সামনে এনে যেন নতুন দিশার খোঁজ।

গঙ্গারামপুর কার্যত এক চলমান গিরগিটির ক্যানভাস। ক্ষমতার অঙ্ক মেলাতে গিয়ে আদর্শ বারবার পিছিয়ে পড়েছে এখানে। কালীতলার চায়ের ঠেকে বসে প্রবীণ কৃষ্ণ দেবনাথের কথায় উঠে এল সারমর্ম, ‘এখানে কখন কোন দলের নেতা কার কাছে বিক্রি হয়ে যাবে, বোঝা মুশকিল। এখানকার ভোটের হিসেব সত্যিই খুব কঠিন।’



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *