এম আনওয়ারউল হক, বৈষ্ণবনগর: নতুন করে বিপর্যয়ের মুখে বৈষ্ণবনগর বিধানসভার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। নীচু এলাকা দিয়ে গঙ্গার জল ঢুকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে শোভাপুর, গোলাপ মণ্ডলপাড়া, হোসেনপুর, ভাঙ্গাটোলা, ভীমা গ্রাম, বীরনগর, মুকুন্দটোলা সহ একাধিক এলাকাকে (Ganga Erosion)। কোথাও বাড়ির উঠোনে জল, কোথাও রাস্তা জলের তলায়। বহু মানুষ কার্যত জলবন্দি। বাড়িঘর ও গবাদিপশু নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আতঙ্ক।
রাত শেষেই বাড়িঘর ছাড়ার প্রস্তুতিতে নদীপাড়ের বাসিন্দারা। কারও গন্তব্য আত্মীয়ের বাড়ি, কেউ আবার অপেক্ষা করছেন প্রশাসনের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। গঙ্গার জল আরও বৃদ্ধি পেলে যে সমূহ বিপদ, তা বুঝতে পারছেন সকলে। যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাস্তা দিয়ে তো জল বইছেই, অস্থায়ী বাঁধগুলিও ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে কেউ অসুস্থ হলে বা প্রয়োজনে অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে কীভাবে হাসপাতালে পৌঁছানো যাবে—তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় স্থানীয়রা। শোভাপুরের বাসিন্দা সামেদ আলি বললেন, ‘জল বাড়লেই দুশ্চিন্তা বাড়ে। ঘরে জল ঢুকবে কি না, রাস্তা থাকবে কি না, কিছুই বোঝা যায় না। নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হয়।’
নদীভাঙনের আতঙ্কও পিছু ছাড়ছে না। গঙ্গার ভাঙনে বহু পরিবার বছরের পর বছর ধরে বসতভিটে হারিয়েছে। নদী ফুলেফেঁপে উঠলেই নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দেয়। তাই জল নামলেও আতঙ্ক দূর হয় না। চর অনন্তপুর এলাকার রফিকুল শেখ বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে তিনবার ঘর সরাতে হয়েছে। নদী একবার ফুলেফেঁপে উঠলে আর কিছু করার থাকে না।’
প্রশাসনের দাবি, বিপন্ন মানুষদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, পরিস্থিতির তুলনায় সেই ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে জলবন্দি এলাকাগুলিতে খাদ্য, পানীয় জল ও ওষুধের অভাব রয়েছে। প্রতিবছর জল বাড়লেই ত্রাণ, নৌকা ও অস্থায়ী ব্যবস্থা করা হয়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান কোথায়? —এই প্রশ্ন নদীপাড়ের বাসিন্দাদের। দীর্ঘমেয়াদি বাঁধ নির্মাণ নিয়ে স্থায়ী পরিকল্পনা বা তার বাস্তবায়ন কোথায়, সেই প্রশ্নও উঠছে।
বর্তমানে কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতায় বিজেপি। কালিয়াচক ৩ নম্বর ব্লকের পঞ্চায়েত সমিতিতেও ক্ষমতাসীন বিজেপি। একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েতও বিজেপির দখলে। স্থানীয় স্তরে একই রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও দুর্ভোগ কমেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে রাজনৈতিক তর্জা নয়, তাঁরা চাইছেন দ্রুত পরিস্থিতির পরিবর্তন। এই মুহূর্তে নদীপাড়ের মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আজ রাতটা নিরাপদে কাটবে তো?
বছরের পর বছর গঙ্গা ভাঙছে। বর্ষা এলেই ফেরে বন্যার আতঙ্ক। প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ে, ত্রাণ পৌঁছায়, মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু জল নেমে যেতেই ফিরে আসে পুরোনো অনিশ্চয়তা। তাই বৈষ্ণবনগরের নদীপাড়ের মানুষের মুখে শোনা যায়, সরকারে যে-ই থাকুক, গঙ্গার গ্রাস থেকে মানুষকে বাঁচাবে কে?

