সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, নিউ জার্সি: টেক্সাসের ডালাসে বিশাল স্টেডিয়ামের চারপাশটা নাকি বড্ড শান্ত (FIFA World Cup 2026 Safety)। ঝকঝকে রাস্তা, সারিবদ্ধ গাড়ি, কর্পোরেট আমেরিকার চেনা ছকে বাঁধা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার বলয়। কিন্তু নিউ জার্সির ডেস্কে বসে ডালাসের গ্যালারির যে ছবিগুলি দেখছি, তা ইউরোপীয় ফুটবলের ব্যাকরণে রীতিমতো বারুদের স্তূপ!
বুধবার সন্ধ্যায় এই ডালাসেই মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড এবং ক্রোয়েশিয়া। আর টেলিভিশনের পর্দায় গ্যালারির দিকে তাকিয়ে রীতিমতো শিউরে উঠতে হচ্ছিল! যেখানে দুই দলের সমর্থকদের জন্য নির্দিষ্ট ও সুরক্ষিত আলাদা জোন থাকার কথা, সেখানে একাসনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসে আছেন ইংরেজ ‘হুলিগান’ এবং ক্রোয়েশিয়ার ‘ব্যাড ব্লু বয়েজ’-এর মতো কট্টরপন্থী সমর্থকরা। বিশ্বজুড়ে বড় বড় স্পোর্টিং ইভেন্ট কভার করার সুবাদে জানি, ইউরোপে এই দৃশ্য অকল্পনীয়। ফুটবলের ইতিহাসে এই দুই দলের সমর্থকদেরই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের এক সুদীর্ঘ ও কুখ্যাত অতীত রয়েছে। বিপক্ষ দলের দুই কট্টর ফ্যানবেসকে এক গ্যালারিতে বসানোর অর্থ হল আক্ষরিক অর্থেই যে কোনও মুহূর্তে প্রলয় ডেকে আনা।
গ্রুপ লিগের ম্যাচ বলে হয়তো রেষারেষি চরম পর্যায়ে পৌঁছায়নি, হারানোর ভয় কম থাকায় আবেগের লাগামটা অন্তত নিজেদের হাতে ছিল। কিন্তু নক আউটের মরণবাঁচন ম্যাচগুলিতে কী হবে? একটা ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ, একটা বিতর্কিত ট্যাকল বা রেফারির একটা ভুল বাঁশিই তো এই গ্যালারিকে নিমেষে রণক্ষেত্রে পরিণত করতে পারে। আমেরিকার নিরাপত্তারক্ষীরা এনএফএল বা বাস্কেটবলের সুশৃঙ্খল ও কর্পোরেট দর্শক সামলাতে অভ্যস্ত। কিন্তু ইউরোপীয় ফুটবলের এই ‘হুলিগানিজম’ বা ফুটবল আবেগের ধারেকাছে যাওয়ার কোনও অভিজ্ঞতাই মার্কিন প্রশাসনের নেই। গত কয়েক সপ্তাহে এখানে যা বুঝলাম, পরিস্থিতি হাতের বাইরে গেলে তা সামাল দেওয়ার ন্যূনতম কৌশলও এদের জানা আছে বলে মনে হল না।
এই ভয়ংকর ঝুঁকির দায়ভার কিন্তু পুরোপুরি ফিফার। শুধুমাত্র মুনাফা লোটার অদম্য লোভে টিকিটের কালোবাজারিকে কার্যত ছাড়পত্র দিয়ে রেখেছে তারা। চড়া দামে হাতবদল হতে হতে টিকিট এমন জায়গায় পৌঁছচ্ছে যে, ফিফা নিজেও জানে না স্টেডিয়ামের কোন প্রান্তে কে বসে আছেন। এর ফলেই ইংল্যান্ডের এক অন্ধ সমর্থক গিয়ে পড়ছেন ক্রোটদের ঠিক মাঝখানে। ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপের এগজিকিউটিভ ডিরেক্টর রোনান ইভেইনও ডালাসের এই অব্যবস্থাপনায় রীতিমতো শঙ্কিত।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হল, যেখানে সত্যিই নিরাপত্তার কড়াকড়ি দরকার- সেই দুই দলের উগ্র সমর্থকদের আলাদা করার ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতা দেখাচ্ছে প্রশাসন। অথচ, গ্যালারিতে আবেগ প্রকাশের নিরীহ মাধ্যম, অর্থাৎ নিজের দেশের পতাকা নিয়ে ঢুকতে পদে পদে বাধা দেওয়া হচ্ছে সাধারণ দর্শকদের। ফিফার নির্দেশিকা বাতাসে উড়িয়ে স্থানীয় রক্ষীরা নিজেদের মর্জিমাফিক নিয়ম চাপাচ্ছেন।
আমেরিকার নিয়মের জাঁতাকলে পড়ে ফুটবলের আদিম স্বতঃস্ফূর্ততার এই অসহায়ত্ব বেশ টের পাচ্ছি। ফিফার সীমাহীন লোভ এবং মার্কিন প্রশাসনের অনভিজ্ঞতা নক আউটের আগে যে এক অদৃশ্য বিপদের মেঘ ঘনিয়ে তুলছে, তা ডালাসের গ্যালারি আজ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

