সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, মায়ামি: বন্ধুর জন্মদিনে তাঁর সেই আবেগঘন বার্তাটা মনে আছে? ‘ফুটবলার লিওর চেয়েও মানুষ হিসেবে ও অনেক বড়।’ কোপাকাবানার বিস্তৃত সৈকত বা বেলো হরাইজন্তের স্বপ্নিল পরিবেশে যাঁদের বেড়ে ওঠা, তাঁদের হৃদয়ের বিস্তার এমন বিশাল হওয়াই হয়তো স্বাভাবিক। লিওনেল মেসি (Lionel Messi) আর নেইমার জুনিয়ারের (Neymar Jr) বন্ধুত্বের সেই সোনালি সুতো বার্সেলোনা থেকে প্যারিস সঁা জঁা হয়ে আজও অমলিন। অথচ গত কয়েকটা বছর এই ব্রাজিলীয় (Brazil) জাদুকরের জন্য কতটা যন্ত্রণাদায়ক ছিল তা হয়তো মেসির মতো সমব্যথী ছাড়া আর কারও পক্ষে অনুধাবন করা অসম্ভব। ৯৮১ দিনের এক দীর্ঘ, অন্ধকার প্রহর পেরিয়ে জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর ফেরাটা ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন। বিশ্বকাপের (FIFA World Cup) মহারণ শেষে নিজের ছেলেকে জড়িয়ে ধরে নেইমারের সেই কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্যটাই বলে দিচ্ছিল, কতটা আবেগের ঝড় বইছিল তাঁর বুকের ভেতর।
চোটের ভ্রুকুটি আর হাজারো সমালোচনা উপেক্ষা করে কার্লো আন্সেলোত্তি যখন তাঁকে বিশ্বকাপের দলে রাখলেন, তখন অনেকেই ভ্রু কুঁচকেছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ৭৬ মিনিটে যখন তিনি মাঠে পা রাখলেন, সত্তর হাজার দর্শকের কানফাটানো শব্দব্রহ্ম প্রমাণ করে দিল জাদুকরের আবেদন আজও কতটা অম্লান। আধাফিট শরীরেও তাঁর সেই নিখুঁত পাস বা ছোট্ট ড্রিবলিং বুঝিয়ে দিয়েছে, জাতশিল্পীর তুলিতে কখনও মরচে ধরে না। আর এই জাদুকরি প্রত্যাবর্তনের মাঝেই খবর রটেছিল, বন্ধু মেসির পথ ধরে তিনিও হয়তো পাড়ি জমাবেন আমেরিকায়। কিন্তু আপাতত সেই জল্পনায় জল ঢেলে দিয়েছেন খোদ ব্রাজিলীয় মহাতারকাই।
জানা গিয়েছে, মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) ক্লাব এফসি সিনসিনাটির দীর্ঘসূত্রিতায় চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে আলোচনার টেবিল থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন নেইমার। ব্যক্তিগত শর্তাবলী মিলে গেলে তিনি চুক্তিতে সই করতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু ক্লাবের স্পোর্টিং ডিরেক্টর ক্রিস আলব্রাইট এবং প্রেসিডেন্ট জেফ বার্ডিং গত এপ্রিলে খোদ ব্রাজিলে উড়ে এসে নেইমার ও তাঁর বাবার সঙ্গে বৈঠক করলেও সিনসিনাটি শেষ পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবই দেয়নি। এই অপেশাদারিত্ব দেখে নেইমারের মনে হয়েছে, ক্লাবটি তাঁকে পাওয়ার ব্যাপারে আদৌ সিরিয়াস নয়। তাই হতাশ হয়েই তিনি এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।
অথচ নিজের শেকড়ের টানে অর্থের মায়া ত্যাগ করতে দুইবার ভাবেননি এই মহাতারকা। ২০১৭ সালে বার্সেলোনা থেকে প্রায় ১৯৮ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশ্বরেকর্ড চুক্তিতে পিএসজি-তে যাওয়া এই ফুটবলার গত বছর যখন নিজের শৈশবের ক্লাব স্যান্টোসে ফেরেন, তখন তিনি হাসিমুখে নিজের বেতনের ৯৯ শতাংশ কাটছাঁট করেছিলেন। ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত যে ক্লাবে তাঁর উত্থান, সেই স্যান্টোসে ২০২৫ সালে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে ৩৭ ম্যাচে ১৫টি গোল করেছেন তিনি। ১৯টি দীর্ঘ মরশুমে ৬৪৪টি ক্লাব ম্যাচে তাঁর মোট গোলসংখ্যা এখন ৩৭৭।
স্যান্টোসের সঙ্গে তাঁর বর্তমান চুক্তির মেয়াদ এই বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। সিনসিনাটির অধ্যায় আপাতত বন্ধ হলেও এমএলএসের দরজা তিনি পাকাপাকিভাবে বন্ধ করেননি। ভবিষ্যতে সঠিক পরিস্থিতি ও উপযুক্ত প্রস্তাব পেলে হয়তো তিনি আমেরিকার মাটিতে খেলার কথা ভেবে দেখবেন। কিন্তু সে তো ভবিষ্যতের হিসেবনিকেশ। আপাতত এসব জাগতিক চুক্তি বা দলবদলের অঙ্ক নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাতে রাজি নন তিনি। ভিনিসিয়াস জুনিয়ার, লুকাস পাকুয়েতা বা ক্যাসেমিরোদের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া আন্সেলোত্তির দলের এখন তাঁকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যই প্রয়োজন। মায়ামির এই স্নিগ্ধ বাতাসে জাদুকরের চোখ এখন শুধুই বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফির দিকে। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ষষ্ঠ নক্ষত্র এনে দেওয়ার সেই অদম্য বাসনাতেই তিনি এখন সম্পূর্ণ বিভোর।

