সানি সরকার, শিলিগুড়ি: দার্জিলিংয়ের কোচবিহার রোড থেকে কয়েক বছর আগেও স্পষ্ট দেখা যেত কাঞ্চনজঙ্ঘা। এখন ‘ঘুমন্ত বুদ্ধ’ ঢাকা পড়েছে বহুতলে (Earthquake risk in Darjeeling high-rises)। ম্যাল থেকে যে রাস্তাটা আস্তাবলের দিকে গিয়েছে, সেখান থেকেও এখন বছরভর দেখা যায় না কাঞ্চনজঙ্ঘা। পাহাড়ের গায়ে মাথা তুলে দাঁড়ানো বহুতলগুলির ‘শিখর’ কতটা গভীরে, তা নিয়ে অনেকের মধ্যে সংশয় রয়েছে। কিন্তু এমন বহুতলের জন্য পাহাড়কে ধরে রাখা গাছের শিকড়গুলি যে কাটা পড়েছে, তা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। তাই বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ৩৪ মিনিটে যখন ফের কেঁপে উঠল পাহাড় সহ উত্তরবঙ্গের বড় একটা অংশ, তখন দার্জিলিংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল নতুন করে। আকাশ ছুঁতে চাওয়া বিল্ডিংগুলি মাটিতে মিশবে না তো, এখন প্রশ্ন এটাই। তথ্য বলছে, এদিন মোট ১৪ বার কেঁপেছে মাটি। যার মধ্যে ৯টির উৎসস্থল সিকিম (Sikkim)। ১১টা ৩৪ মিনিটে ঘটে যাওয়া কম্পনের তীব্রতা রিখটার স্কেলে ৪.৬। বাকিগুলি তিনের মধ্যে।
প্রায় দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এমন ধারাবাহিক কম্পনের মূলে কি শুধুই টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ, নাকি ম্যান্টলের ওপর ভাসমান প্লেটগুলি সমান্তরাল অবস্থানে আসছে, এমন প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ গবেষণা ছাড়া রাতারাতি সদুত্তর পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু এখনই সতর্ক না হলে যে অদূরভবিষ্যতে চরম মাশুল গুনতে হবে, সে ব্যাপারে সতর্কতা ভূ-বিজ্ঞানীদের। তাঁদের সাফ কথা, এখনই বৃক্ষচ্ছেদন, পাহাড়ি অঞ্চলে বহুতল নির্মাণে নিয়ন্ত্রণ না আনা গেলে সমূহ বিপদ ঘটবে। যদিও এই পরামর্শ বা সতর্কবার্তা নতুন নয়। দার্জিলিং যখন সিসমিক জোন-৪’এ ছিল, তখন থেকেই ভূ-বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন। মূলত বড় নির্মাণের ক্ষেত্রে রাশ টানা এবং নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু তাতে কোনও আমল দেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতেও ঝুঁকির বহুতল নির্মাণের ক্ষেত্রে নজরদারি রাখা বা রাশ টানা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছুটা কঠোর পদক্ষেপ করতে চাইছে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ)। যে বহুতলগুলি রয়েছে, তার স্ট্যাটাস জানার পাশাপাশি ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ করা উচিত, তা নির্দিষ্ট করতে একটি বিশেষজ্ঞ সংস্থাকে দিয়ে সমীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জিটিএ। সংস্থার জনসংযোগ আধিকারিক শক্তিপ্রসাদ শর্মা বলেন, ‘ছোট ছোট ভূকম্পন হলেও আমরা সতর্ক। যে কারণে একটি সংস্থাকে দিয়ে কাজ করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার ওই সংস্থার সঙ্গে আমাদের পর্যালোচনা বৈঠক হবে।’
কেন এত চিন্তা? প্রথমত, ইন্ডিয়ান ব্যুরো অফ স্ট্যান্ডার্ডস সম্প্রতি ভূকম্পপ্রবণ এলাকার যে মানচিত্র প্রকাশ করেছে, তাতে এই অঞ্চলের অবস্থান সিসমিক জোন-৬’এ। অর্থাৎ হিমালয় এবং হিমালয় সংলগ্ন এলাকা রয়েছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায়। দ্বিতীয়, এখন অধিকাংশ কম্পনের উৎসস্থল তিস্তা সংরক্ষণ অঞ্চল। উল্লেখ্য, ২০১১-র ১৮ সেপ্টেম্বর ঘটে যাওয়া ভূকম্পনের উৎসস্থল ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা সংরক্ষণ এলাকা। ওইদিন ৬.৯ মাত্রার কম্পনে সিকিম তো বটেই, কেঁপে উঠেছিল উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও তিব্বত। একাধিক বাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। সবমিলিয়ে মৃত্যু হয়েছিল ১১১ জনের। আবহাওয়া দপ্তরের সিকিমের কেন্দ্রীয় অধিকর্তা গোপীনাথ রাহার বক্তব্য, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে সতর্কতাই একমাত্র পথ।’
