দামিনী সাহা, আলিপুরদুয়ার : শরতের আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা। শিউলি ফুলের গন্ধ আর কাশের দোলায় মহালয়া পেরিয়ে যেতেই শহরের বাতাসজুড়ে এখন উৎসবের আগমনী সুর। কিন্তু আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) কলেজপাড়ায় উৎসবের ঢাকটা শুধু মণ্ডপে বাজে না, বাজতে শুরু করে পাড়ার প্রতিটি বধূর মনে। এই পাড়ার পুজোর গল্পটা অন্য সব পুজোর থেকে আলাদা। এখানে কোনও স্পনসরশিপ নেই, নেই কোনও বাহ্যিক চাকচিক্য। আছে শুধু পাড়ার নারীদের অদম্য উদ্দীপনা আর একটি পুরোনো ফোটো ফ্রেম(Picture body) ঘিরে থাকা ১৮ বছরের স্মৃতি।
উদ্যোক্তারা জানান, প্রায় আঠারো বছর আগে কলেজপাড়ায় কোনও পুজো হত না। সেই সময় দুর্গাপুজো(Durga Puja) মানেই ছিল পাড়ার মানুষজনের অন্যত্র যাওয়া, কিংবা কোনও একটি বিশেষ বাড়ির পুজোয় ভিড় জমানো। পুরো পাড়াকে একসূত্রে বাঁধার মতো নিজস্ব কোনও উৎসব ছিল না বললেই চলে। সেই অভাবটাই গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল পাড়ার তিন বধূ অর্চনা দাস, নূপুর দাস এবং দেবশ্রী ঘোষকে।
কথাগুলো বলতে বলতে ৬৩ বছরের প্রবীণা অর্চনা দাসের চোখেমুখে ভেসে ওঠে এক অন্যরকম আলোর প্রভা। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘কলেজপাড়াতে আগে কোনও পুজো হত না। শুধু একটা বাড়িতে পুজো হত। তখন আমরা তিন বধূ মিলে ঠিক করলাম এখানে আমরা পুজো করব। তিনজনের হাত ধরে শুরু হওয়া প্রমীলা সংঘের পুজো আজ আঠারো বছরে পা দিয়েছে।’
পুজো শুরুর বিশেষ রীতিটি হল, প্রথম থেকেই সেখানে বাঁধাই করা রয়েছে দেবী দুর্গার একটি ফোটো ফ্রেম। মহালয়ার ভোরে মণ্ডপ প্রাঙ্গণের একটি পুরোনো বেল গাছের তলায় প্রতিষ্ঠিত করা হয় সেই ফোটো ফ্রেমটি। মহালয়া থেকে শুরু করে ষষ্ঠীর বোধন পর্যন্ত টানা কয়েকদিন ধরে ওই বেল গাছতলাতেই দেবীর পুজো ও আরাধনা চলে। এরপর ষষ্ঠীর দিন যখন মণ্ডপে মায়ের বড় প্রতিমার বোধন হয়, তখন ফোটো ফ্রেমটি প্রতিমার পাশে রাখা হয়।
দশমী পর্যন্ত মৃন্ময়ী মায়ের মূর্তির পাশাপাশি পুজো পান ফোটো ফ্রেমের দেবীও। প্রতিমা বিসর্জনের পর ওই ফোটো ফ্রেমটি আবার স্থান পায় এক বধূর বাড়ির মন্দিরে।
বর্তমানে পাড়ার প্রায় ৫০ জন মহিলা এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত।
পুজো কমিটির সদস্য নূপুর দাস হেসে তাঁদের ব্যস্ততার কথা জানান। তিনি বললেন, ‘চাঁদা তোলা থেকে শুরু করে বাজারঘাট, সমস্ত কিছু আমরা মহিলারাই করি। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঘুরে ঘুরে পুজোর প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাকাটা করার মধ্যে যে কী এক অদ্ভুত আনন্দ আছে, তা বলে বোঝানো যাবে না।’
তিনি আরও জানান, কেবল কেনাকাটাই নয়, দেবীকে মণ্ডপে নিয়ে আসা থেকে শুরু করে নিরঞ্জনের শোভাযাত্রা, প্রতিটি ধাপে পাড়ার ছোট-বড় সকলেই উৎসবে মেতে ওঠেন।
