সায়ন চট্টোপাধ্যায়, শিলিগুড়ি : ‘যারা খুব সেজেছে হায়, লোকে নজর না লাগায়…, হই হই হই করব বলে…’ সমাজমাধ্যমে ভাইরাল গানটি ইতিমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে পুজোর প্লে লিস্টে। টেকস্যাভি জেন জেডের রিল থেকে রিংটোনে এখন কলকাতার তরুণ শিল্পী রোহিতের গান। হেডফোন কানে গুঁজে গুনগুন করে নতুন গানে সুর মেলাচ্ছেন উত্তরের ছেলেমেয়েরাও। তবে শুধু শুনছেনই না, গান বাঁধছেনও। নেপথ্যে শিলিগুড়ির একঝাঁক তরুণ।
হাতে বড় প্রযোজনা সংস্থার জোর নেই, নেই বিপুল প্রচারের আয়োজন। ভরসা নিজেদের ভাবনা, বন্ধুত্ব আর ইউটিউব। সেই চেষ্টায় ভর করে এ বছর পুজোর মুখে নতুন গান বেঁধেছেন দ্য তাণ্ডব থিওরি ব্যান্ড(The Tandav Principle band) এবং অরিজিৎ পাল ও তাঁর বন্ধুরা।
পুজোর গান মানে বাঙালির আবেগ। আগেও-এখনও। পুজো সংখ্যার মতোই বছরভর অপেক্ষায় থাকা। অডিও ক্যাসেট-সিডির জমানার বিদায়ের পর পুজোর গান এখন নস্টালজিয়ার খাতায়। এক সময়ে অডিও ক্যাসেট কেনার পর পাড়ার প্যান্ডেলে বারবার বাজিয়ে মুখস্থ করে ফেলার দিন আর নেই, গানের শ্রোতা এখন দর্শক। পছন্দ না হলে আঙুলের এক ছোঁয়াতেই গান বদলে ফেলা যায়। এই বদলে যাওয়া সময়ে পুজোর গানের আবেগকে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন শিলিগুড়ির তরুণ-তরুণীরা।
ব্যাংককর্মী শুভ্রদীপ্ত সরকার ও তাঁদের দল শিলিগুড়িতে(Siliguri) ‘মনফকিরা’ ফোক-ফিউশন ব্যান্ড নামেই দীর্ঘদিন পরিচিত। নতুন প্রোজেক্টের জন্য পুরোনো ও নতুন সদস্যদের মিশেলে তৈরি করেছেন দ্য তাণ্ডব থিওরি। তাঁদের নতুন গান পুজোর প্রেম নিয়ে। গানের লিরিক্সে, ‘এবার পুজায় অষ্টমীতে দেখব তোমায় শাড়িতে’- সমাজমাধ্যমে বেশ নজর কেড়েছে। পুজোর দিনে প্রিয় মানুষকে নতুন সাজে দেখার অপেক্ষা- এই চেনা অনুভূতিকেই গানের সুরে বেঁধেছেন দলের সদস্যরা। গানটির কথা, সুর ও কণ্ঠ- তিনটিরই দায়িত্ব সামলেছেন শুভ্রদীপ্ত নিজেই। গিটারে ছিলেন বিপ্লব দে সরকার, শুভঙ্কর দত্ত ও বিশ্বজিৎ কর। সিন্থেসাইজারে অরুণাভ সেনগুপ্ত গানে আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছেন। তালে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন শুভ্রজিৎ শর্মা। ভোকালিস্টের কথায়, ‘ছোটবেলা থেকে পুজোর আগে বাড়িতে ক্যাসেট আসতে দেখেছি। সেই স্মৃতিই পুজোর আগে নতুন গান প্রকাশের তাগিদ তৈরি করেছে। অ্যাপল মিউজিক, অ্যামাজন মিউজিক, ইউটিউব, গানা ও স্পটিফাইয়ের মতো একাধিক প্ল্যাটফর্মেও রয়েছে নতুন গানটি। শ্রোতারা নিজেদের পুজোর প্রেমের নানা মুহূর্ত লিখে পাঠাচ্ছেন, কেউ কেউ নাচের রিলও পাঠাচ্ছেন। সমাজমাধ্যমে এই সাড়া তাঁদের উৎসাহ বাড়াচ্ছে।’
অন্যদিকে, শিলিগুড়ির জেন জেড অরিজিৎ পাল(Arijit Pal) ও তাঁর বন্ধুদের এ বছরের গান ‘ফিরে ফিরে আসে দুর্গা মা’। ১০-১২ জনের টিমের পরিশ্রমের ফসল এই গানটি ইউটিউবে রিলিজ করেছে মহালয়ার দিন। ভিডিওতে ফুটে উঠেছে বন্ধুত্বের গল্প। এ বছর পুজোর গানটির কথা ও সুর অরিজিতের। তাঁর সঙ্গে গেয়েছেন অর্ক আচার্য, জয়া দে ও সৌরভী সরকার। রেকর্ডিং ও মিক্সিং করেছেন দেবর্ষি বসাক। ভিডিও পরিচালনায় এই প্রথম হাত পাকিয়েছেন অরিজিৎ। ডিওপি বিশ্বজিৎ কুণ্ডু। গানে অভিনয়ে রয়েছেন রূপক ঘোষ, প্রীতি সরকার, সুমি সাহা, সুদীপা সরকার, রানা ঘোষ ও অভয় পালরা। বন্ধুত্বই এই উদ্যোগের প্রধান শক্তি। গানের ভাবনা নিয়ে অরিজিৎ-এর কথা, ‘পুজো মানে শুধু আলোর রোশনাই, সাজসজ্জা কিংবা উৎসবের জাঁকজমক নয়, পুজো মানে ঘরে ফেরা, পুরোনো বন্ধুত্বে ফিরে যাওয়া, মা-বাবার কাছে ফেরা, নিজের শহরের টান অনুভব করা। যাঁরা কাজের সূত্রে বাইরে থাকেন, তাঁদের পুজোর সময় ঘরে ফেরার আবেগই এই গানের অন্যতম অনুপ্রেরণা।
এর আগে ২০২১ সালে ‘এলো রে শরৎ এলো’ দিয়ে পুজোর গান প্রকাশের যাত্রা শুরু করেন অরিজিৎরা। ২০২৩ সালে ‘তুই মানে’ এবং ২০২৪ সালে ‘ভুল করে ছুঁয়ে দিলে’ প্রকাশিত হয়। মহালয়ার সন্ধ্যায় ১০ অক্টোবর বাঘা যতীন পার্কে একটি অনুষ্ঠানে গানটির স্ক্রিনিং তাঁদের কাছে ছিল স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। তবে অরিজিতের আক্ষেপ, ছোট শহরে আর্থিক সহযোগিতা পেলে আরও বড় পরিসরে কাজ করা সম্ভব। উপযুক্ত সহযোগিতা পেলে শিলিগুড়ি তথা উত্তরবঙ্গে নতুন ধরনের কাজ করার স্বপ্ন দেখেন তাঁরা।
কলকাতার ‘হই হই হই করব বলে’ যখন ভাইরালের দৌড়ে, তখন শিলিগুড়ির তরুণদের এই উদ্যোগ যেন নতুন করে আশা দেখাচ্ছে। তাঁদের কথায়, জনপ্রিয়তার নিরিখে পাল্লা দেওয়ার চেয়েও বড় কথা নিজেদের শহরের জন্য নিজেদের গান তৈরি করা। ঠিক করেছেন, পুজোর কয়েকদিন অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে নিজেদের পুজোর নতুন গানই শোনাবেন তাঁরা।

