প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: দশপ্রহরণধারিণী সিংহবাহিনী মহিষাসুরমর্দিনীর রূপ বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ পরিবৃত্ত এক সম্পূর্ণ চালচিত্র। কিন্তু সেই চেনা পারিবারিক কাঠামোর একদম বাইরে গিয়ে চার সন্তানকে বাদ দিয়ে কেবল জয়া ও বিজয়াকে সঙ্গে নিয়ে আরাধনা করা হয় পূর্ব বর্ধমানের (Purba Burdwan) গুসকরার ঐতিহ্যবাহী ঘটকবাড়িতে। চার শতাব্দী বা চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে দেবীপক্ষে এই ব্যতিক্রমী মৃণ্ময়ী রূপেই পূজিত হয়ে আসছেন দেবী দুর্গা (Durga Puja 2026)। জাঁকজমকপূর্ণ থিম পুজো এবং আধুনিক আলোর ঝলকানিতে ভরা ডিজিটাল যুগেও এই বনেদি পরিবার তাদের চারশতবর্ষের সাবেকি রীতিনীতিতে সামান্যতম পরিবর্তন আনেনি, যা গুসকরার এই বিগ্রহকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র ও অনন্য মাহাত্ম্য।
পৌরাণিক উপাখ্যান ও লোকগাথা অনুযায়ী, মহাদেবের সঙ্গে বিয়ের পর পার্বতী যখন কৈলাসে যাত্রা করেন, তখন তাঁর সহচরী হিসেবে আট সখীকে পাঠানো হয়েছিল। দেবীর সেই অষ্টসখীর মধ্যে জয়া ও বিজয়া ছিলেন অন্যতম প্রধান, যাঁদের নিখুঁত উল্লেখ পাওয়া যায় কালিকা পুরাণ ও দেবী পুরাণে। যদিও বাংলায় সাধারণত চার সন্তান সহ দুর্গাপুজোর প্রথা সর্বাধিক প্রচলিত, তবে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে এই আরাধনার ধারায় বৈচিত্র্য রয়েছে। বিশেষত ওডিশার বিভিন্ন স্থান এবং পুরীর বিখ্যাত জগন্নাথ ধামের বিমলা মন্দিরেও দেবী দুর্গার দু’পাশে চার সন্তানের পরিবর্তে জয়া ও বিজয়ার মূর্তি স্থাপনের ইতিহাস ও প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে। অনেকে মনে করেন, সেই আঞ্চলিক উপাসনার বিশেষ রীতির সঙ্গেই গুসকরার এই ঘটকবাড়ির চারশতবর্ষের পূজার প্রতিমার রূপগত ও ধর্মীয় অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
বর্তমান সময়ে চারপাশের নানা পরিবর্তনের সাগরে ভেসে গেলেও ঘটক পরিবার তাদের নিজস্ব পারিবারিক ঐতিহ্য, স্মৃতি এবং প্রাচীন বিশ্বাসকে বিন্দুমাত্র বিকৃত হতে দেয়নি। এই পারিবারিক পুজো প্রমাণ করে যে বাংলার দুর্গোৎসবের শিকড় কেবল একটি নির্দিষ্ট সামাজিক প্রথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে নানা পৌরাণিক গল্প ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির মেলবন্ধন। তাই প্রতি বছর পুজোর মরশুমে গুসকরা ও তার আশপাশের এলাকা থেকে প্রচুর দর্শনার্থী প্রাচীন এই মন্দিরে আসেন দেবী দুর্গার এই বিরল ও ব্যতিক্রমী রূপ প্রত্যক্ষ করতে। চার শতাব্দী অতিক্রম করার পরও স্বকীয়তায় উজ্জ্বল গুসকরার ঘটকবাড়ির এই আরাধনা আজও স্থান পায় দর্শনার্থীদের সেরা পছন্দের তালিকায়।

