কোচবিহার: বাংলার শারদোৎসব (Durga Puja 2026) মানেই এক অন্য আবেগ। কিন্তু কোচবিহারের (Cooch Behar) রাজপরিবারের ঐতিহ্যবাহী বড়দেবীর পুজোর (Borodebi Puja) স্বাতন্ত্র্য সমস্ত প্রচলিত প্রথাকে ছাড়িয়ে যায়। পাঁচশো বছরেরও বেশি পুরোনো এই পূজাবার্ষিকীতে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটলেও রাজ আমলের আদি ও অকৃত্রিম প্রথাগুলো আজ পর্যন্ত সমানভাবে অক্ষুণ্ণ রয়েছে। দেবীর প্রতিমার গঠনশৈলী, রূপবৈচিত্র্য, বিশেষ আচার থেকে শুরু করে বলিপ্রথার নানা দিক এই উৎসবকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। শনিবার সকালে নির্দিষ্ট তিথি মেনে মহাসমারোহে বড় দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়, যা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তদের ঢল নামে।
এই প্রাচীন পুজোর সূত্রপাত নিয়ে বিভিন্ন লোককথা প্রচলিত রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, মহারাজা নরনারায়ণ স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই দেবীপুজোর গোড়াপত্তন করেছিলেন। আবার অন্য এক ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেকে মনে করেন যে, মহারাজা বিশ্বসিংহ মাত্র নয় বছর বয়সে বাল্যকালে খেলাচ্ছলে শুকনো ময়না কাঠের ডাল ও বাঁশের কঞ্চি মাটিতে পুঁতে দেবী দুর্গার আদলে পুজো করেছিলেন, যা থেকে এই রাজকীয় পুজোর সূচনা হয়। শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রথা অনুযায়ী, প্রতি বছর শ্রাবণ মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে কোচবিহারের ডাঙরাই মন্দিরে ময়না কাঠের যুগচ্ছেদন পুজোর মাধ্যমেই মূল উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় ময়না কাঠ মদনমোহন বাড়িতে এনে টানা এক মাস পুজো করা হয় এবং রাধাষ্টমী তিথিতে বিশেষ পালকিতে চাপিয়ে তা দেবীবাড়ির বড়দেবী মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। মূলত সেই কাঠ থেকেই চিত্রকর পরিবারের নিপুণ হাতে খোদাই করে তৈরি হয় বড় দেবীর প্রতিমা।
অন্যান্য দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গে এই প্রতিমার গঠনগত ফারাক আকাশ-পাতাল। সাধারণ প্রতিমার মতো মায়ের দুই পাশে গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী বা কার্তিক থাকেন না; পরিবর্তে দেবীর সঙ্গে অবস্থান করেন জয়া ও বিজয়া। এছাড়া মায়ের বাহন হিসেবে বাঘ ও সিংহের পাশাপাশি সাপও থাকে। পুজোর অন্যতম প্রধান অঙ্গ হল বলিপ্রথা। সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত নিয়ম মেনে বলির ধারা বজায় থাকে, যার মধ্যে অষ্টমীর মোষ বলি এবং দশমীতে বিসর্জনের আগে শূকর বলি দেওয়ার প্রাচীন নিয়ম রয়েছে। এছাড়া এই উৎসবকে ঘিরে রয়েছে এক অতি গোপনীয় ও লোমহর্ষক আচার। অতীতে নরবলির প্রচলন থাকলেও বর্তমানে তা নিষিদ্ধ। তবে আজও অষ্টমীর রাতে সিদ্ধেশ্বরী এলাকার রায় পরিবারের সদস্যরা বিশেষ গুপ্তপুজোর সময় নিজেদের আঙুল কেটে রক্ত নিবেদন করেন, যে আচার চলাকালীন জনসাধারণের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকে।
অষ্টমীর দিনে নির্দিষ্ট প্রথা মেনেই প্রথমে কোচবিহারের জেলাশাসক অঞ্জলি প্রদান করেন। ঐতিহ্য অনুসারে রাজপরিবারের প্রতিনিধি দুয়ারবক্সী পরিবারের সদস্যেরও উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও, এবার তাঁর উপস্থিত নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এই পুজো কোচবিহারবাসীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের বড় প্রতীক। দেবীবাড়ি ও মন্দির চত্বরকে কেন্দ্র করে বসা জমজমাট মেলা কোচবিহার শহর ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জেলা এবং নিম্ন অসমের মানুষকেও চুম্বকের মতো টানে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে গেলেও রাজ আমলের বিশ্বাস ও শতাব্দীপ্রাচীন পরম্পরাকে আঁকড়ে ধরেই প্রতি বছর দুর্গোৎসবের কদিন মুখরিত হয়ে ওঠে কোচবিহারের বড় দেবীর চত্বর।

