শতাব্দী সাহা, চ্যাংরাবান্ধা: দেশ শুধুমাত্র এক টুকরো মাটি নয়, অস্তিত্বের অপর নাম। তাই তো দেশভাগের পরে দেশছাড়া হতে হলেও নিজের শিকড়কে ভোলা যায় না। এই কথাটারই যেন বেশি করে প্রমাণ দেয় চ্যাংরাবান্ধার সূত্রধর পরিবার ও ভোটবাড়ির সিংহ পরিবার। দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়ে একসময় পরিবারগুলি ওপার থেকে এপারে চলে এসেছিল। সূত্রধর ও সিংহ পরিবার আজও তাদের দুর্গোৎসবে ওপারের ঐতিহ্য, পরম্পরা ও নিয়মনিষ্ঠা বজায় রেখেছে। একসময় বাংলাদেশ থেকে এসে চ্যাংরাবান্ধা (Changrabandha) রেলওয়ে ওভারব্রিজ সংলগ্ন সূত্রধরপাড়ায় বসতি বানিয়ে থাকতে শুরু করেছিল সূত্রধর পরিবার। প্রায় ৪৩ বছর পুরোনো পুজোটি এখন পারিবারিক গণ্ডি ছাড়িয়ে গোটা পাড়াতেই জনপ্রিয়। যদিও পুজোর (Durga Puja 2025) সিংহভাগ দায়িত্ব এখনও সূত্রধর পরিবারেরই। অন্যদিকে ভোটবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের সিংহবাড়ির ঠাকুরদালান জুড়েও মায়ের মূর্তি গড়ার কাজ জোরকদমে চলছে।
সূত্রধরবাড়ির দুই ভাই রমেশচন্দ্র সূত্রধর এবং ক্ষিতিশচন্দ্র সূত্রধর। রমেশ বললেন, ‘বাংলাদেশের ধামরাই থানার নরসিংহপুরের গ্রামের বাড়িতে কে পুজো শুরু করেছিলেন তা সঠিক মনে নেই। তবে আমার দাদু স্বর্গীয় গদাধরচন্দ্র সূত্রধরের হাতে আমরা পুজো হতে দেখেছি। এরপর বাবা শ্রীধর সূত্রধর সেই দায়িত্ব পান। দেশভাগের পর আমরা চার ভাই চ্যাংরাবান্ধায় চলে আসি। এখানের বাড়িতে পুজো শুরু হয়। বড় দুই দাদা নরেশচন্দ্র ও পরেশচন্দ্র বেঁচে নেই। তবে আমাদের চার ভাইয়ের পরিবার মিলেই পুজো হয়।’
বাড়ির উঠোনে বর্তমানে পুজোমণ্ডপ তৈরি হচ্ছে। ক্ষিতিশ জানালেন, সম্পূর্ণ বৈষ্ণব মতে আমাদের পুজো হয়। ষষ্ঠী থেকে নবমী খিচুড়ি, নানারকম ভাজা, পায়েস, লুচি, সুজি সহ মিষ্টি মা-কে ভোগ দেওয়া হয়। দশমীর ভোগে শাপলা পান্তা দেওয়া আমাদের বহু প্রাচীন রীতি।
দশমীতে মণ্ডপ থেকে ধরলার ঘাটে প্রতিমা নিরঞ্জন-এর জন্য সকলে বেরিয়ে গেলে সেই মণ্ডপেই নারায়ণপুজো শুরু হয়। নিরঞ্জন থেকে ফিরে সকলে আগে সেই পুজোর শিন্নি প্রসাদ গ্রহণ করেন। পুজোর দায়িত্ব সামলান পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম মানিক, অক্ষয়, বাপ্পা সূত্রধররা। তাছাড়া পাড়ার অনেকেই সাহায্য করেন। মূর্তি আসবে চ্যাংরাবান্ধার মানিক পালের কাছ থেকে। এছাড়া প্রতিদিন সন্ধ্যায় নানা অনুষ্ঠান থাকবে। দশমীর দিন সন্ধ্যায় বাচ্চাদের জন্য কুইজ ও বড়দের জন্য ধুনুচি নাচের প্রতিযোগিতা এই পুজোর অন্যতম ঐতিহ্য।
অন্যদিকে চ্যাংরাবান্ধা-মেখলিগঞ্জ সড়কের ধারেই ভোটবাড়ির সিংহবাড়ির মূল পুজো হত বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার চাঁদপুর মহকুমার গোবিন্দা গ্রামে তাদের আদিবাড়িতে। বর্তমানে সে পুজোর দায়িত্বে বিমলকুমার সিংহ। ব্যস্ততার ফাঁকে বললেন, ‘ঠাকুরদা নৃপেন্দ্রনারায়ণ সিংহের পূর্বপুরুষরা ওপারে পুজো শুরু করেছিলেন। দেশভাগের নানা ঝামেলায় পুজো বন্ধ থাকার পর ৩০ বছর আগে ফের আমরা পুজো শুরু করি। মহালয়া থেকেই ঘট বসে পুজো শুরু হয়ে যায়। দশমীতে নয়, একাদশী তিথি পার হয়ে মাকে ধরলার ঘাটে বিসর্জন দেওয়া হয়। কীর্তন গান হয়।’
এদিকে মহালয়া থেকেই নিরামিষ চলে বলে জানালেন বিমলের স্ত্রী পাপড়ি। সপ্তমীতে লুচি, সুজি, ফল, মিষ্টি, অষ্টমীতে খিচুড়ি ভোগ এবং নবমীতে পোলাও, পাঁচ পদের ভাজা, মিষ্টি থাকে ভোগে। দশমীতে পুঁটি মাছ দিয়ে বিশেষ যাত্রা বরণ হয়। মহাষ্টমীতে এলাকাবাসীর জন্য প্রসাদের ব্যবস্থা থাকে। বাড়ির মেয়ে মৌমিতা সিংহ বললেন, ‘সব আত্মীয় ও বাড়ির সকলে এই সময় বাড়ি ফেরে। এক বছরের অপেক্ষা শেষে সকলেই আনন্দে মেতে ওঠে।’
