শিবশংকর সূত্রধর ও প্রসেনজিৎ সাহা, মধ্য মশালডাঙ্গা (সাবেক ছিটমহল): ভারতীয় পরিচয়পত্রের দৌলতে এখন পরিযায়ী শ্রমিক হয়েছেন সাবেক ছিটের বাসিন্দারা। নাগরিকত্ব না থাকার জন্য ২০১৫ সালের আগে পুলিশি হয়রানির ভয়ে যে বাসিন্দারা ভিনরাজ্যে যেতেন না, তাঁরা এখন ভোটার কার্ড, আধার কার্ড পেয়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন। কেউ দিল্লি, কেউ উত্তরপ্রদেশ। সাবেক ছিটমহল দিনহাটার (Dinhata) মধ্য মশালডাঙ্গাজুড়ে একই ছবি।
তবে পরিযায়ী শ্রমিক হয়েও স্বস্তি নেই। নাগরিকত্ব পাওয়ার দশ বছর পরেও কাজের সন্ধানে তাঁদের ভিনরাজ্যে যেতে হচ্ছে। এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, ঠিক সেভাবেই এখন পাল্লা দিয়ে বেড়েছে উদ্বেগের পরিমাণ। বিভিন্ন রাজ্যে যেভাবে বাংলাভাষীদের হেনস্তার মুখে পড়তে হচ্ছে, তাতে আতঙ্ক গ্রাস করেছে এখানকার পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যেও। কিছুদিন আগেই তুফানগঞ্জের এক পরিযায়ী শ্রমিককে হরিয়ানাতে বাংলাদেশি সন্দেহে আটকে রেখে মারধরের অভিযোগ উঠেছিল। সাবেক ছিটমহল পোয়াতুরকুঠির বাসিন্দা মহিরুদ্দিন আলির কথায়, ‘যেভাবে ভিনরাজ্যে আমাদের ছেলেমেয়েদের ওপর অত্যাচার চলছে তাতে আমরা খুবই চিন্তিত। ভারতীয় নাগরিকত্বের স্বাদ পাওয়ার এক দশক পূরণ হলেও কোথাও যেন নিজ ভূমে পরবাসীর মতো প্রতিনিয়ত আতঙ্ক তাড়া করছে আমাদের। যদি রাজ্যেই কর্মসংস্থান হত তাহলে হয়তো ভিনরাজ্যে আতঙ্ক নিয়ে থাকতে হত না।’
আন্তর্জাতিক স্তরে সমস্যা মেটার পর ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে থাকা ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় হয়। নাগরিকত্বহীন হয়ে থাকা বাসিন্দারা নতুন করে পরিচয় পান। তাই বৃহস্পতিবার রাত বারোটার পর থেকেই স্বাধীনতার আনন্দে মেতে ওঠেন তাঁরা। জাতীয় পতাকা উত্তোলন, ক্রিকেট টুর্নামেন্ট সহ নানা অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেও বিষাদের সুর আবদুল্লাদের গলায়। যখন ছিটমহল বিনিময় হয় তখন সদ্য কৈশোর থেকে যৌবনে পা দিয়েছিলেন আবদুল্লা শেখ। ভেবেছিলেন এবার হয়তো নিজের এলাকাতেই কর্মসংস্থানের দিশা দেখা যাবে। কিন্তু হয়নি। আবদুল্লা এখন দিল্লির পরিযায়ী শ্রমিক। সঙ্গে তাঁর মা, বাবাও। শুক্রবার সকালে দিনহাটা-২ ব্লকের নাজিরহাট-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্য মশালডাঙ্গায় জাতীয় পতাকা তোলার জন্য তোড়জোড় চলছিল। সেখানে হাত লাগিয়েছিলেন আবদুল্লাও। আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘২০১৫ সালে আমরা অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম। তবে এখন ভিনরাজ্যে কাজ করে সংসার চালানোটাই আমাদের কাছে বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ একই সুরে জহরুল শেখের মন্তব্য, ‘আগে আমাদের কাছে নাগরিকত্বের কোনও প্রমাণ ছিল না। তাই পুলিশের ভয়ে ভিনরাজ্যে কাজে যেতে পারতাম না। ছিটমহল বিনিময়ের পর ২০১৭ সাল থেকে আমি দিল্লিতে রাজমিস্ত্রির কাজ করছি। মাঝেমধ্যে বাড়িতে আসি।’ মধ্য মশালডাঙ্গার মহম্মদ সেলিম শেখ ও তাঁর স্ত্রী হাসেদা বিবি কয়েক বছর ধরে উত্তরপ্রদেশে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেছেন। তাঁরাও উদ্বেগে।
মধ্য মশালডাঙ্গায় ঘুরলে একটি জিনিস সহজেই নজর কাড়ে। রাস্তার দু’পাশে নির্মীয়মাণ পাকাবাড়ি। কোনওটার পাকা ছাদ। আবার কোনওটার দেওয়াল পাকা, কিন্তু চাল টিনের। কিছু বাড়ি নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, কিছু বাড়ির চলছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, অধিকাংশ বাড়ির সদস্যই ভিনরাজ্যে কাজ করেন। পরিযায়ী শ্রমিকরাই কার্যত ভোল বদলে দিচ্ছেন সাবেক ছিটমহলের।
কিন্তু এরকম বদল তাঁরা চাননি। তাঁরা চেয়েছিলেন নিজের এলাকাতে থেকেই রুটিরুজির সন্ধান। এলাকার তরুণ সাদ্দাম হোসেনের কথা, ‘যেহেতু একটি গ্রামীণ প্রত্যন্ত এলাকা তাই এখানে সরকারের উচিত কর্মসংস্থানের উপর নজর দেওয়া। কুটিরশিল্প, সেলাইয়ের কাজের প্রশিক্ষণ, কৃষিনির্ভর প্রশিক্ষণ দিয়ে যদি কর্মসংস্থান করা যায় তাহলে এখানকার মানুষদের আর পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করতে হবে না।’
গত এক দশকে ধীরে ধীরে রাজনীতি প্রবেশ করেছে মধ্য মশালডাঙ্গায়। গ্রামে প্রবেশের মুখেই নজর কাড়ে উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহর ছবি সংবলিত একটি হোর্ডিং। তবে শুধু রাজনীতি বা প্রতিশ্রুতি নয়, কর্মসংস্থানের জন্য এগিয়ে আসুক সরকার, এমনটাই চাইছেন বাসিন্দারা।
