প্রসেনজিৎ সাহা, দিনহাটা: শীতকালের কুয়াশায় এমনিতেই রাস্তা দেখা দায়। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনা। তবে রবিবার শীতের সন্ধ্যায় এরকমই একটা দুর্ঘটনা নাড়িয়ে দিল দিনহাটা (Dinhata) শহরবাসীকে। তবে শহরের ঝুড়িপাড়ার এই দুর্ঘটনায় কোনও মানুষের প্রাণ যায়নি, গিয়েছে এক কুকুরছানার। মৃত সন্তানের দেহ রাত পর্যন্ত আগলে থাকল তার মা ‘মণি’। খাবার-জল দিলেও সেদিকে নজর ছিল না মায়ের। শেষে রাতে এলাকাবাসী কুকুরছানাটিকে কবর দেন।
দিনহাটা শহরের অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা ঝুড়িপাড়া রোড। রবিবার সন্ধ্যায় সেই রাস্তা পার হতে গিয়ে হঠাৎই একটি বাইক পিষে দেয় কুকুরছানাটিকে। আর মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ায় ঘটনাস্থলেই মারা যায় ছানাটি। ছানাটির মা এলাকাবাসীর কাছে ‘মণি’ নামেই পরিচিত। সে এসে সন্তানের নিথর দেহ আগলে বসে থাকে রাত এগারোটা পর্যন্ত। পথচলতি অনেকেই তাকে সরানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পারেনি। যেন সন্তানকে আর কোনও গাড়ি এসে ধাক্কা না মারে!
স্থানীয় বাসিন্দা তাতাই সাহা বললেন, ‘পাঁচ বছর ধরে এই এলাকাতেই রয়েছে কুকুরটি। আদর করে সবাই তাকে ‘মণি’ বলে ডাকে। এক মাস আগে মণি দুটো ছানার জন্ম দেয়। তার মধ্যে একটিকে কেউ পোষ মানানোর জন্য বাড়ি নিয়ে যায়। আরেকটি ছানা মণির সঙ্গেই থাকত। কিন্তু রবিবার সন্ধ্যায় হঠাৎই একটি বাইকের ধাক্কায় বাচ্চাটি মারা যায়।’
আরেক এলাকাবাসী তাপস জানালেন, রাতে কাজ থেকে ফিরে এসেও তাঁরা দেখেন মৃত ছানার দেহ আগলে ঠায় বসে রয়েছে মণি। নিথর দেহটা তুলে সে বারবার নেড়ে দেখেছে, চাটছে, ডাকছে। যেন সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না, আর জাগবে না তার ছানাটি।
মণির এই দুঃখ দেখে চুপ থাকতে পারেননি তাতাই, তাপস কিংবা পার্থ কুণ্ডু, লক্ষ্মীকান্ত রাজভর, অনুপ সাহারা। মৃত কুকুরটিকে কবর দেওয়ার জন্য নিয়ে যেতে চাইলে প্রথমে বাধা দিচ্ছিল মণি। পার্থ বললেন, ‘একরকম জোর করেই বাচ্চাটাকে নিয়ে যাই আমরা।’ তাঁরা ওই রাস্তার পাশেই একটি গর্ত খুঁড়ে মৃত কুকুরছানাকে সেখানে রেখে দেন। তখনও মণির চোখে ছিল তার ছানাকে ফিরে পাওয়ার বাসনা।
এরপর যখন কুকুরছানাটিকে মাটি চাপা দেওয়ার কাজ শেষ হয় তখনও মণি একবার ছুটে যাচ্ছে দুর্ঘটনাস্থলে। আবার কখনও দৌড়ে যাচ্ছে রাস্তার পাশে যেখানে তার সন্তানকে রাখা হয়েছে। সেই দৃশ্য নাড়িয়ে দিয়েছিল সবার হৃদয়কেই। সঙ্গে বুঝিয়ে দিয়েছিল, ভালোবাসা আর শোক, দুটোরই কোনও প্রজাতি নেই।
