দিনহাটা: ভোটের ফলে পালাবদলের ইঙ্গিত মেলার পর থেকেই বেপাত্তা দিনহাটার গুরু ও শিষ্য জুটি। প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহর মতো এখন তালা ঝুলছে তঁার একদা ছায়াসঙ্গী তাপস দাসের বাড়িতেও। তবে, তাপস সশরীরে হাজির না থাকলেও তঁার নামের ‘ত্রাস’ স্বমহিমায় বিরাজ করছে দিনহাটা-২ ব্লকের বিভিন্ন এলাকায়।
এদিন তাপসের ঘাটপাড়ের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, বাড়ি ফঁাকা। কেউ নেই। ঝুলছে তালা। একই দৃশ্য চোখে পড়ল দাসপাড়া এলাকায় তঁার পুরোনো বাড়ির চত্বরে। সেখানে তঁার প্রাক্তন পড়শিদের বয়ানে যা জানা গেল তা দক্ষিণী সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। দিনহাটার ত্রাস এই তাপস একসময় ছিলেন একজন দিনমজুর। ডুয়ার্স এলাকায় বালির গাড়ি ঢুকলে মাল খালাস করতেন তিনি। তবেই দু’বেলা দু’মুঠো জুটত তঁার পরিবারের। এরপর ধূমকেতুর মতো উত্থান। বাম আমলে সিপিএমের শ্রমিক সংগঠনে যোগ দিয়ে পথচলা শুরু। এরপর নানা ‘কর্মকাণ্ড’-এর মধ্যে দিয়ে গুন্ডাবাহিনীর মাথা হয়ে ওঠা। ধমক-চমক, হামলা, গুন্ডাগিরি করে উঠে আসেন উদয়নের নেকনজরে। তঁার ভয়ে কার্যত কঁাপত এলাকা। বিরোধী নেতাদের বাড়িছাড়া করার মতো কাণ্ড ছিল তঁার কাছে জলভাত।
এরপর, ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে জিতে প্রধান হতেই বদলে যায় তাপসের শরীরী ভাষা। দহরম-মহরম আরও বাড়ে শাসকদলের সঙ্গে। প্রকারান্তরে উদয়নের ছায়াসঙ্গী হয়ে ওঠেন তাপস। উদয়নের বাড়িতে সর্বক্ষণ দেখা মিলত তঁার। দলের ‘গুন্ডাবাহিনী’র লাগাম চলে আসে এই তাপসের হাতে। প্রভুদের কাছ থেকে সবুজসংকেত মিললেই শুরু হত একের পর এক অপারেশন। পাল্লা দিয়ে ফুলেফেঁপে উঠতে থাকে তঁার সম্পত্তির বহর। একসময়ে নুন আনতে পান্তা ফুরোনো তাপসের বাড়ির গ্যারাজে তখন দঁাড়িয়ে থাকত বিলাসবহুল গাড়ি। তঁার অধীনে কাজ করত বেশ কিছু ডাম্পার। এই সময়েই ঘাটপাড় এলাকায় প্রাসাদোপম পেল্লায় বাড়ি তোলেন তাপস। এছাড়া দিনহাটায় তঁার আরও কয়েকটি বাড়ি ছিল বলে জানেন মানুষ।
এত সম্পত্তির উৎস কী? বিজেপি নেতা আনোয়ার হোসেনের কথায়, ‘পঞ্চায়েত প্রধান থাকাকালীন দেদার কাটমানি আদায় আর তোলাবাজি চলত তাপসের উদ্যোগে। এছাড়াও তাঁর প্রচুর বেআইনি ব্যবসা ছিল।’ তবে, কথায় বলে, ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়।’ ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর থেকেই প্রতাপ কমতে থাকে দাপুটে নেতা তাপসের। সেবার পঞ্চায়েতের টিকিট পেলেও আর তঁাকে প্রধান করেনি দল। যদিও এর নেপথ্যে তৃণমূলের ঘরোয়া দলাদলি ছিল বলেই মনে করেন জানকার মহল। উদয়নও দূরত্ব বজায় রাখতে থাকেন তঁার সঙ্গে। তবে এবার বিধানসভা নির্বাচনের আগে উদয়নের ভোট ম্যানেজারের দায়িত্বে ফিরেছিলেন তাপস। ভোটের আগে নিজের বাহিনী গড়ে তুলে, পুরোনো মেজাজে এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তাপস। বিজেপি কর্মীদের মারধর ও হুমকির অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে ফলপ্রকাশের পর এলাকায় আর কেউ তাপসের টিকিটিও দেখেননি।
পালাবদলের পর এলাকাবাসী চাইছেন, এবার তাপসের বিচার হোক। আনোয়ার বলেন, ‘আশা করছি, এঁদের আয়ের উৎস নিয়ে এবার তদন্ত হবে।’ এদিকে দিনহাটা আসনে বিজেপির জয়ী প্রার্থী অজয় রায়ের কথায়, ‘অনৈতিক কাজে যুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তৃণমূলের ফেরার নেতা তাপসের নম্বরে এদিন একাধিকবার ফোন করা হলেও সাড়া মেলেনি।
