অমৃতা দে, দিনহাটা: প্রাক্তন মন্ত্রী উদয়ন গুহর প্রভাবে দিনহাটার (Dinhata) শিক্ষাঙ্গনে ‘থ্রেট সিন্ডিকেট’ সক্রিয় ছিল (Menace Syndicate)। রাজনৈতিক পালাবদলের পরই একাধিক শিক্ষকের বিদ্যালয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, সহকর্মীদের হুমকি দেওয়া ও শিক্ষাঙ্গনে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরির নানা অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। ভোটের ফল প্রকাশের পর পরিস্থিতি বদলাতেই এবার চাপে পড়েছেন সেসব অভিযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা। এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন যোগেশ সাহা উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষিকা রূপা দেব। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের দিনহাটা শহর ব্লকের মহিলা সভানেত্রী ছিলেন। অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি টিচার ইনচার্জের দায়িত্ব পান। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপর নানা ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।
স্থানীয় সূত্রে খবর, ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর তিনি গা-ঢাকা দিয়েছেন। ৬ মে বিদ্যালয়ের মেলে পদত্যাগপত্র পাঠালেও এখনও পর্যন্ত চার্জ হ্যান্ডওভার করেননি। পরে স্কুল কমিটি ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা আলোচনার মাধ্যমে নির্মলকুমার বর্মনকে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকের দায়িত্ব দেন। তবে শুক্রবার ফের মেল করে রূপা জানান, তিনি অসুস্থ। মেডিকেল সার্টিফিকেট পাঠিয়ে আপাতত চার্জ হ্যান্ডওভার করতে পারবেন না বলে দাবি করেন। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা স্বর্ণা সাহা বলেন, ‘রূপার থ্রেট কালচারে শিক্ষক-শিক্ষিকারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। রুমে ফ্যান চালাতে দিতেন না, পড়ুয়া না থাকলেও বসিয়ে রাখা হত। অ্যাকাডেমিক কাজের চেয়ে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেই বেশি ব্যস্ত থাকতেন।’ বর্তমান ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক নির্মলকুমার বর্মন বিষয়টি স্কুল কমিটির প্রেসিডেন্ট ও এআইকে জানিয়েছেন।
শুধু রূপাই নন, এরকম আরও অনেক শিক্ষক রয়েছেন যাঁরা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দিনহাটাজুড়ে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। গোপালনগর এমএসএস উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক অমিতাভ সরকারের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে সমাজমাধ্যমে একাধিক ব্যক্তিকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি ছিলেন। উদয়নের ছেলে সায়ন্তন গুহ’র ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অমিতাভকেও বর্তমানে এলাকায় দেখা যাচ্ছে না।
প্রশ্ন উঠছে, দিনহাটা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক দীনেশচন্দ্র রায়কে নিয়েও। অভিযোগ, ভোট প্রচারে তাঁকে সক্রিয়ভাবে দেখা গেলেও বর্তমানে তিনি বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। দিনহাটা ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ঝন্টু বিশ্বাসের দাবি, পাড়ায় ভোটের প্রচারে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। বিভিন্ন সময় ভোট দেওয়ার জন্য চাপও সৃষ্টি করেছিলেন। সেকারণে ফলাফলের পর লুকিয়ে রয়েছেন। যদিও সহকর্মীদের দাবি, তিনি মেডিকেল লিভে রয়েছেন।
সমাজমাধ্যমে আলোচনায় উঠে এসেছে একই বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক জয়ন্ত চক্রবর্তীর নাম। ২০২১ সালের নির্বাচনে তিনি উদয়নের নির্বাচনি প্রতিনিধি ছিলেন। অভিযোগ, সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে দিনহাটার মানুষের উদ্দেশ্যে তিনি ‘ধমক’ দিতেন। যদিও জয়ন্তর কথায়, ‘আমাকে হুমকি দিয়ে অনেক পোস্ট করানো হয়েছে। আমার ওপর সায়ন্তন গুহ চাপ সৃষ্টি করতেন। নিজেকেও বিভিন্ন সময় আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। উদয়ন নিজেই ফেসবুকে পোস্ট করে আমাকে আক্রমণ করতেন। উত্তরবঙ্গ সংবাদের বিরুদ্ধে লেখার জন্য সায়ন্তন আমাকে চাপ দিত।’ এই ঘটনাগুলি সামনে আসতেই দিনহাটার শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব ও ভয়ের সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
