নয়াদিল্লি ও শ্রীনগর: দিল্লি বিস্ফোরণের চারদিন পর প্রধান অভিযুক্ত চিকিৎসক উমর উন নবি’র পুলওয়ামার বাড়ি বিস্ফোরণে গুঁড়িয়ে দিল নিরাপত্তাবাহিনী। কৈল গ্রামে ওই বাড়িটি শুক্রবার ভোরে বিস্ফোরক দিয়ে ধ্বংস করা হয়। বিস্ফোরণে জড়িত সন্দেহে বৃহস্পতিবার যে ৬ জনকে আটক করেছিল জম্মু ও কাশ্মীরের পুলিশ, তাঁদের মধ্যে তিনজন উমরের নিকটাত্মীয়। শুক্রবার আরও পাঁচজনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কানপুরের কার্ডিওলজিস্ট মোহাম্মদ আরিফ মির এবং হাপুরের গাইনিকলজিস্ট ফারুখ। দুজনেই কাশ্মীরি।
লালকেল্লার কাছে মেট্রো স্টেশন চত্বরে বিস্ফোরণের তদন্ত যত এগোচ্ছে, তত স্পষ্ট হচ্ছে, হামলাটি বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়, বরং কাশ্মীর সহ একাধিক রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা সংগঠিত জঙ্গি নেটওয়ার্কের পরিকল্পিত অপারেশন। শুক্রবার ধৃতদের মধ্যে আরেক চিকিৎসক শাহিনা সইদের ঘনিষ্ঠ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। যে শাহিনাকে জইশের মহিলা শাখার ভারতের প্রধান বলে মনে করা হচ্ছে।
বিস্ফোরণের সঙ্গে একের পর এক রাজ্যে নানা যোগ পাওয়া যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার ডালখোলা থেকে এনআইএ শুক্রবার একজনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গিয়েছে। ওই তরুণও পেশায় চিকিৎসক ও হরিয়ানার বাসিন্দা বলে জানা গিয়েছে। দিল্লিতে বিস্ফোরণের পর তিনি বাড়িতে এসেছিলেন। অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্ফোরণের সমর্থনে পোস্ট করার অভিযোগে অসমে গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়ছে। শুক্রবার পর্যন্ত ওই সংখ্যা ২০।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা দাবি করেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিচ্ছে। সুইৎজারল্যান্ড-ভিত্তিক এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ থ্রিমারের মাধ্যমে উমর, মুজাম্মিল গনাই এবং শাহিনা সইদ যোগাযোগের তথ্য উঠে এসেছে তদন্তকারীদের হাতে। উমর আবার কয়েকজনকে নিয়ে একটি ছোট সিগন্যাল গ্রুপ পরিচালনা করতেন। যে গ্রুপে গোপন বার্তা, বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ সংগ্রহ ও অপারেশনের তথ্য আদানপ্রদান হত।
ঘটনার পর পাঁচদিন কেটে গেলেও দিল্লি এবং সংলগ্ন এলাকায় এখনও আঁটোসাঁটো নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। শহরজুড়ে চলছে তল্লাশি, চেকপোস্টগুলিতে কড়া নজরদারি। নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে সংসদ ভবন, ইন্ডিয়া গেট, সুপ্রিম কোর্ট, রেড ফোর্ট সহ দিল্লির সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। উমরের বিস্ফোরণের আগের দিনের প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যালোচনা করতে গিয়ে দিল্লি পুলিশের হাতে ৫০টিরও বেশি সিসিটিভি ফুটেজ এসেছে, যাতে তাঁর শেষ রাতের রোডম্যাপ স্পষ্ট। ফরিদাবাদ থেকে রওনা হয়ে নুহ জেলার ফিরোজপুর ঝিরকায় গাড়ি থামিয়ে রাস্তার ধারের দোকান থেকে খাবার কেনা, দীর্ঘসময় গাড়িতে অপেক্ষা এবং অবশেষে ১০ নভেম্বর সকালে বাদরপুর সীমান্ত দিয়ে দিল্লিতে ঢোকার ছবি ওতে ধরা পড়েছে।
বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টা আগে পর্যন্ত উমরের পাঁচটি মোবাইল বন্ধ ছিল। ফরিদাবাদের আল ফালাহ মেডিকেল কলেজের দুটি ঘর থেকে উদ্ধার ডায়েরি ও নোটবুকে উল্লিখিত এনক্রিপ্টেড নোটে সংখ্যার ধারাবাহিকতা, কোড, তারিখ ইত্যাদিতে একাধিক হামলার পরিকল্পনার ইঙ্গিত আছে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন। উমরের হাতে সংগৃহীত নগদ ২৬ লক্ষ টাকায় প্রায় ২৬ কুইন্টাল এনপিকে সার কেনা হয়েছিল। কৃষক ও খনিকর্মীর পরিচয় দিয়ে তিন-চার মাস ধরে হরিয়ানার নুহ, ফরিদাবাদ, গুরুগ্রাম ও উত্তরপ্রদেশের সাহারনপুরের বিভিন্ন দোকান থেকে অল্প অল্প করে কেনা হয় ওই রাসায়নিক। তদন্তকারীরা বলছেন, কেনাকাটা এত ধীরে ও বিচ্ছিন্নভাবে করা হয়েছে যেন দোকানদারদের সন্দেহ না হয়। অন্তত তিনজন সার ডিলারকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাঁরা অনলাইনে টাকা পেয়েছিলেন।উমরদের ২০ লক্ষ টাকার তহবিলের একাংশ দিয়ে শ্রীনগর থেকে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ও কার্তুজ আনা হয়েছিল বলেও প্রমাণ মিলেছে।
