রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি: ১৯৩৫ সালে কলকাতায় জন্ম। বাবা ব্রিটিশ, ব্যবসা করতেন। মা বাঙালি। ছেলে ঝরঝরে বাংলায় দারুণ। দীর্ঘ ৩০ বছর ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কাউন্সিলে (বিবিসি) সাংবাদিকতা করেছেন। এর মধ্যে ২০ বছর ধরে সংস্থার দিল্লির ব্যুরো চিফ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রচুর বই লিখেছেন। সেই মার্ক টুলির স্মরণে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (ডিএইচআর) বিশেষ চার্টার্ড চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মার্ক গত ২৫ জানুয়ারি নয়াদিল্লিতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে মৃত্যুর পরও বন্ধু ও সহকর্মীদের বুকে তিনি অমর। তাঁদের কয়েকজনের উদ্যোগ ও রেলের সম্মতিতে ডিএইচআর চার্টার্ড পরিষেবা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। রবিবার একটি হেরিটেজ স্টিম ইঞ্জিন টয়ট্রেন নিয়ে কার্সিয়াং থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত ছুটবে (Darjeeling Toy Prepare)।
দার্জিলিং পাহাড়, বাংলা আর টয়ট্রেন- এই তিনের প্রতি মার্কের অমোঘ টান ছিল। সেই বিষয়টিকে মাথায় রেখেই প্রয়াত সাংবাদিকের বন্ধুরা ঠিক করেছিলেন, চিরাচরিত শোকসভার বদলে তাঁরা বিশেষ যাত্রার আয়োজন করবেন। পরিকল্পনামাফিক ডিএইচআরের কাছে আবেদন জানানো হয়। তাতে সাড়া দিতে কর্তৃপক্ষ বিন্দুমাত্র দেরি করেনি। পর্যটনের প্রসারে একাধিক চার্টার্ড রাইড ও জয়রাইড থাকলেও বন্ধুর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এমন উদ্যোগ অভিনব বলে তাঁরা জানিয়েছেন। ডিএইচআর ডিরেক্টর ঋষভ চৌধুরীর আশা, দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে দার্জিলিং টয়ট্রেনের গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তা এভাবেই আরও বাড়বে।
অন্যদিকে, কোচবিহারের রাজকুমারীকে ঘিরে প্রচলিত লোককথার ওপর ভিত্তি করে হেরিটেজ তকমাপ্রাপ্ত ডিএইচআর পূর্ণিমার রাতে জয়রাইড চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে ‘মহারানিজ গ্রেট এসকেপেড’। মার্চের প্রথম পূর্ণিমাতেই এই যাত্রার সূচনা হওয়ার কথা। জনশ্রুতি বলে, গল্পটি ১৯২০ সাল নাগাদ। কোচবিহারের এক রাজকন্যা দার্জিলিং সফরে এসেছিলেন। তাঁকে স্থানীয় উইন্ডমেয়ার হোটেলে একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে এসে তাঁর একঘেয়ে লাগছিল। সুযোগ বুঝে তিনি ডিএইচআর-এর তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজারের সাহায্যে সেখান থেকে চুপ করে বেরিয়ে আসেন। জ্যোৎস্নার আলোয় টয়ট্রেনেই নিজের মতো করে এক পার্টি আয়োজন করেন। তখন পূর্ণিমার রাত। রাজকীয় পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। সেইমতোই ডিএইচআর একটি জয়রাইড শুরু করতে চলেছে। শুধুমাত্র পূর্ণিমার রাতেই এই পরিষেবা দেওয়া হবে। ‘প্রিমিয়াম’ এই পরিষেবায় প্রতি যাত্রায় সর্বোচ্চ তিনজন যাত্রীকে নেওয়া হবে। রাতেই চাঁদের আলোতে চা পাতা তোলার অনুভূতি দিতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন চা বাগান সংস্থার সঙ্গে রেল কথা বলছে। তাদের দিক থেকে সবুজ সংকেত এলে ভাড়ার বিষয়টিও নির্ধারিত হবে।
ডিএইচআর-এর ডিরেক্টর ঋষভ চৌধুরী জানিয়েছেন, এই নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে সেই রোমাঞ্চকর অভিযানকে আধুনিক মোড়কে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলছে। বিকেল সাড়ে ৫টায় তিনধারিয়া ওয়ার্কশপে ঢুকবেন পর্যটকরা।
এরপর ৬টা নাগাদ তিনধারিয়া স্টেশন ছাড়বে খেলনাগাড়ি। ট্রেনেই তিব্বতি চা পরিবেশন করা হবে। রংটংয়ে খানিকক্ষণ দঁাড়ানোর পর ৭টা নাগাদ সেখান থেকে ছেড়ে ১১টার মধ্যে সুকনা হয়ে পৌঁছাবে গুলমা চা বাগানে। গুলমায় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রাতের খাবারের ব্যবস্থা থাকছে। যাত্রীদের জন্য রয়েছে চাঁদের আলোয় চা পাতা তোলার অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ।
এর পাশাপাশি ডিএইচআর মার্চ মাসেই ‘বাঘেরাস ট্রেল–দ্য সানসেট রাইড এক্সপেরিয়েন্স’ নামে আরও একটি পরিষেবা চালু করতে চলেছে। যেখানে হেরিটেজ রেল ভ্রমণের সঙ্গে প্রকৃতি অন্বেষণের সুযোগ থাকবে। কার্সিয়াং বন দপ্তরের সহযোগিতায় পর্যটকদের পাহাড়ে এক বিশেষ আউটডোর অভিজ্ঞতার জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ট্রেনটি সকাল ১০টায় ছাড়বে। অংশগ্রহণকারীরা কার্সিয়াংয়ের ডাউহিলে সমবেত হবেন। সেখানে বনকর্মীদের তত্ত্বাবধানে প্রায় দুই ঘণ্টার একটি ট্রেকিং হবে। এছাড়াও স্থানীয় ফরেস্ট মিউজিয়াম, হেভেন ভিউপয়েন্ট এবং একটি পুরোনো মঠ দেখার বিকল্প ব্যবস্থাও থাকবে। ট্রেকিং শেষে যাত্রীদের গাড়িতে করে কার্সিয়াং রেলওয়ে স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে সূর্যাস্তের আগেই টয়ট্রেনটি মহানদীর উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। পথে গিদ্দা পাহাড়ে একবার বিরতি দেওয়া হবে। ওই সময় কেউ চাইলেই নেতাজি মিউজিয়াম দেখার সুযোগ পাবেন।
