ম্যালে যখন কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে শেষ বিকেলের আবির মাখানো রোদটুকু নিভে আসে, তখন এক অন্যরকম ঘ্রাণ মেলে। সেই সুবাস আধুনিক রেস্তোরাঁ বিলাসিতার কৃত্রিম মশলার নয়, পাহাড়ি পাকশালার ধ্রুপদি আখ্যান।
শুভঙ্কর চক্রবর্তী, দার্জিলিং: সকাল থেকেই দার্জিলিং (Darjeeling Native Meals) খানিকটা থমথমে। পাহাড়ের বাঁকে মেঘেরা থমকে দাঁড়িয়েছে। চৌরাস্তার হিমেল বাতাসে মিশে যাচ্ছে ঘোড়ার খুরের শব্দ। হাতঘড়ি বলছে বেলা ১২টা পেরিয়ে গিয়েছে। লাদেন লা রোড ধরে হাঁটার সময় বাতাসে ভেসে আসছিল এক অপার্থিব সুবাস। না, সেই ঘ্রাণ মোমো বা থুকপার পরিচিত গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, তা যেন হিমালয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনও আদিম রান্নাঘরের এক বিস্মৃতপ্রায় নির্যাস। সঙ্গী চালক বললেন, ‘মনে হয় শাফালে ভাজা হচ্ছে।’ পর্যটকদের কোলাহল আর গ্লেনারিজের কফির কাপের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে এমন কিছু স্বাদ, যা লুপ্ত হওয়ার মুখে। অথচ এই খাবারগুলোই এককালে ছিল পাহাড়ি মানুষদের মূল জীবনীশক্তি। আধুনিক রেস্তোরাঁর চাকচিক্যে অভ্যস্ত পর্যটকরা অধিকাংশ সময়েই হদিস পান না সেইসব হেঁশেলের, যেখানে রান্নার উপাদানে মেশানো থাকে বুনো জঙ্গলের রহস্য আর পাহাড়ের মায়া।
পুরসভা ভবন পেরিয়ে ট্যাক্সিস্ট্যান্ডের পাশ দিয়ে গোলকধাঁধার মতো স্যাঁতসেঁতে সিঁড়ি দিয়ে নামছি। দু’দিকের পাথুরে দেওয়াল বেয়ে চুইয়ে পড়ছে হিমেল জল। খানিক নীচে এককোণে ছোট্ট দোকানে বসে রয়েছেন এক তিব্বতি বৃদ্ধা। জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, সামনে সাজানো থকথকে জেলির মতো খাদ্যবস্তুটির নাম ‘ফাম্বি’। সামান্য লংকার চাটনিতে ডুবিয়ে মুখে দিতেই মনে হল হিমালয়ের মৌন বুঝি এই প্রথম জিভে ধরা দিল। তিতকুটে নয়, অথচ অদ্ভুত এক মিষ্টতা আর মসৃণতা নিয়ে তা কুয়াশার মতোই শরীরে মিলিয়ে গেল। বৃদ্ধা জানালেন, মূলত শুকনো মটর ডাল ভিজিয়ে, বেটে ছেঁকে নিয়ে তার থকথকে নির্যাস থেকে তৈরি করা হয় ফাম্বি। কেউ কেউ মুগ ডালের গুঁড়োকে সযত্নে ফুটিয়েও ফাম্বি বানান।
ম্যালে যখন কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে শেষ বিকেলের আবির মাখানো রোদটুকু নিভে আসে, তখন এক অন্যরকম ঘ্রাণ মেলে। সেই সুবাস আধুনিক রেস্তোরাঁ বিলাসিতার কৃত্রিম মশলার নয়, পাহাড়ি পাকশালার ধ্রুপদি আখ্যান। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে যেমন রডোডেনড্রন তার রং বদলায়, তেমনই দার্জিলিংয়ের নিভৃত হেঁশেলগুলোতে আজও সযত্নে রক্ষিত আছে এমন কিছু স্বাদ, যা কোনও আধুনিক মেনুকার্ডের তোয়াক্কা করে না। সেই স্বাদগুলো আসলে পাহাড়ের মানুষের হাড়কাঁপানো শীতে টিকে থাকার উষ্ণ রসদ, এক একটি বিলুপ্তপ্রায় সংস্কৃতির জ্যান্ত ফসিল।
টাইগার হিলের দিকে যাওয়ার পথে ছোট এক ঝুপড়িতে বসে চায়ের অর্ডার দিতেই দেখা গেল, কাঠের উনুনে তখন ফুটন্ত তেলে তৈরি হচ্ছে ‘শাফালে’ (Mountain Meals)। ময়দার আধারে মোড়া কিমা করা মাংসের এই কড়া ভাজা পিঠের প্রথম কামড়েই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা গরম ভাপ আর ডল্লে খুরসানি লংকার তীব্র ঝাঁঝ যেন নিস্তেজ রক্তে নাচন ধরিয়ে দিল। যেন খাবার নয়, এক পরম উষ্ণ আলিঙ্গন। পাহাড়ের কৃষিজীবী মানুষের জীবনগাথা আসলে লুকিয়ে আছে ‘গুন্দুক’ আর ‘সিনকি’-র মধ্যে। দুটি খাবারই সংরক্ষণের এক বিস্ময়কর শিল্প। সর্ষে শাককে পচিয়ে, রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হয় গুন্দুক। এর অনন্য টক স্বাদের বর্ণনা দেওয়া মুশকিল। গাঁজানো পদ্ধতিতে তৈরি হয় সিনকি। মূলত মুলোর ছোট টুকরো বা কুচি দিয়ে তৈরি। এটি শুকিয়ে রাখা হয় এবং পরে সুপ বা আচার হিসেবে খাওয়া হয়। উপাদানগুলো পাহাড়ের মিতব্যয়ী জীবনের প্রতিচ্ছবি।
খাবেন নাকি স্যর? মাঝবয়সি দোকানি দেউকি ছেত্রীর কথা ফেরানো গেল না। ঝুপড়ির টেবিলে যখন গুন্দুকের ঝোল আর গরম ভাত পাতে এল, সেই আদিম টক-ঝাল গন্ধ জানান দিল কেন পাহাড়ের মানুষ এত অজেয়। তার সঙ্গেই দেওয়া হল ‘কিনামা’। গাঁজানো সয়াবিনের সেই উগ্র, তীব্র ঘ্রাণ প্রথমবার খানিকটা বিচলিত করলেও, তার স্বাদের গভীরতা ছিল অতুলনীয়। যেন ঠান্ডায় শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখার মন্ত্র। কিনামা খাওয়ার অভিজ্ঞতা আধুনিক রেস্তোরাঁ বিলাসিতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেয়।
অনেক খুঁজে জাকির হোসেন রোডের ধারে মিলল কালি দিদি’র সাজানো-গোছানো দোকান। সেখানেই পাওয়া গেল ‘নিংরো’। পাহাড়ি ফার্নের কচি সবুজ ডগাগুলো স্থানীয় নরম ‘চুরপি’ কুচির সঙ্গে রান্না করা হয়েছে। সেই পদের এক অপার্থিব স্বাদ। চুরপি নিজেই হিমালয়ের এক মহাবিস্ময়। গোরুর দুধের ছানাকে দীর্ঘ সময় ধরে শুকিয়ে পাথরের মতো শক্ত করে তোলা এই পনিরের টুকরো মুখে নিয়ে চিবোতে চিবোতে পাহাড়ের পাকদণ্ডি বেয়ে পথ চলা এক অনন্য অনুভূতি। তবে নিংরোতে ব্যবহৃত চুরপি শক্ত নয়, নরম। পাহাড়ের পুরোনো খাবারের খোঁজ করতেই কালি দিদি এনে দিলেন ‘থাংথুক’-এর বাটি। দেখলাম নুডলসগুলো হাতে ছিঁড়ে ছোট ছোট বর্গাকার টুকরো করে সুপে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি চামচে সেই নরম ময়দার স্বাদ আর আদার কড়া ঘ্রাণে মনে হল সময় যেন কয়েক শতাব্দী থমকে দাঁড়িয়ে আছে কোনও এক প্রাচীন গুম্ফার ছায়ায়।
পাহাড়ি তিতকুটে স্বাদের এক অনন্য উদাহরণ হল ‘তিতা ফাপর’। এটি মূলত পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলের খাবার। জোড়বাংলো বা ঘুম স্টেশনের কাছের ছোট হোটেলগুলোতে এর সন্ধান মেলে। চাটনি বা আচারের সঙ্গে ৩০-৪০ টাকার এই রুটিজাতীয় খাবারটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে বলেই বিশ্বাস করেন স্থানীয়রা। দার্জিলিংজুড়েই ‘শেল রুটি’-র মিষ্টি মৌতাত। চালের গুঁড়ো আর ঘিয়ের মিশ্রণে তৈরি আংটির মতো রুটিটি বাইরে মচমচে আর ভেতরে তুলতুলে। গরম শেল রুটির সঙ্গে ঝাল আলুর দম মুখে দিলে পৃথিবীর সমস্ত দামি খাবার-এর কাছে নতমস্তক। চকবাজারের একটি পুরোনো রেস্তোরাঁয় পাওয়া গেল ‘শ্যাপটা’। পাতলা করে কাটা মাংসের টুকরো আদা আর লংকার কড়া আঁচে ভেজে তৈরি হয় শ্যাপটা। কেবল পেটের ক্ষুধা নয়, আত্মার তৃপ্তি জোগায় খাবারটি। পুলিশ স্টেশনের কাছেই পাহাড়ের বিশেষ অর্ঘ্য ‘খাপসে’ বা মাখন-ময়দার বিস্কুট পাওয়া গেল। তা যেন শেষপাতে মিষ্টির মতো।
দার্জিলিংজুড়েই (Darjeeling Tourism) রয়েছে স্থানীয় খাবারের অফুরন্ত ভাণ্ডার। পরিতাপের বিষয় হল, বিশ্বজুড়ে যখন ফুড ট্যুরিজমের জয়জয়কার, তখন আমাদের হিমালয়ের এই অমূল্য রত্নরাজি আজও অবহেলিত। সরকারি স্তরে এই আদিম রন্ধনশৈলীকে বিশ্বের দরবারে ব্র্যান্ডিং করার বা জনপ্রিয় করার কোনও সুদূরপ্রসারী সদিচ্ছা চোখে পড়ে না। গ্লেনারিজ বা কেভেন্টার্সের বাইরেও যে এক বিশাল আদিম স্বাদের জগৎ আছে, তা পর্যটকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো কোনও সুপরিকল্পিত পরিকাঠামো আজও গড়ে ওঠেনি। আধুনিক পিৎজা বা বার্গারের চাকচিক্যে এই আদি স্বাদেরা আজ নিজভূমে ব্রাত্য। পাহাড়ের বাস্তুসংস্থান যেমন সংকটে, তেমনই এই অকৃত্রিম খাদ্যসংস্কৃতিও আজ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই লড়ছে। যদি সঠিক উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে অচিরেই দার্জিলিংয়ের এই আসল ঘ্রাণটুকু হয়তো কেবল পুরোনো ডায়েরির হলদেটে পাতায় বন্দি হয়ে রয়ে যাবে। পাহাড়ের সেই আদিম হেঁশেলগুলো আসলে কেবল রান্নাঘর নয়, সেগুলো হিমালয়ের স্পন্দন, যা কুয়াশার চাদর জড়িয়ে আজও বেঁচে আছে মানুষের পরম মমতায়।
