সোয়েব আজম ও সানি সরকার, দার্জিলিং ও শিলিগুড়ি: আর আসব না। পরিচিতদেরও বলব না আসতে। ক্ষোভ, ক্লান্তি এবং বুকভরা তিক্ততা নিয়ে দার্জিলিং স্টেশনে (Darjeeling) রাতের অন্ধকারে কথাগুলি বললেন বিহারের মুঙ্গেরের বাসিন্দা পারুল শা। শুধু তিনি নন, শৈলরানির বর্তমান বিশৃঙ্খলার সাক্ষী থেকে চরম বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকরা। পর্যটনের নামে কার্যত খোলাখুলি জুলুমবাজি চলছে পাহাড়ে, অভিযোগ তাঁদের। এই পরিস্থিতি অবশ্য নতুন নয়, বছরের পর বছর ধরে মূলত গ্রীষ্মের সময় দার্জিলিং হয়ে ওঠে নৈরাজ্যের পাহাড়। বেড়াতে এসে ঝামেলায় জড়াতে না চাওয়া পর্যটকরা কোনও লিখিত অভিযোগ করেন না। ফলে প্রশাসনের বক্তব্য থাকে, ‘লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’। কিন্তু প্রশ্ন হল, পর্যটনই যেখানে পাহাড়ের ফুসফুস, তখন কেন প্রশাসনিক নজরদারি থাকবে না?
শুধু কালো মাথার ভিড়। চকবাজার থেকে ক্লাবসাইড রোড, ম্যাল থেকে রাজভবনের সামনে দিয়ে চিড়িয়াখানা যাওয়ার রাস্তা, সর্বত্রই পর্যটকদের কোলাহল। এই কোলাহল থেকেই শোনা যাচ্ছে দার্জিলিং নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং ক্ষোভের কথা। এমন ভিড়েই ছিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের তরুণ প্রামাণিক। শিলিগুড়িতে ছেলের যোগাসন প্রতিযোগিতার সূত্রে প্রথমবার সপরিবারে এসেছেন পাহাড় দর্শনে। বাঙালির ‘রথ দেখা, কলা বেচা’। কিন্তু পাহাড়ের পথ ধরার আগেই তিনি বুঝতে পারেন ভ্রমণ ততটা সুখকর হবে না। তরুণ বলছেন, ‘শিলিগুড়ির পরিচিতদের কাছ থেকে খরচের একটা হিসেব নিয়ে বাজেট করেছিলাম। কিন্তু এনজেপি পৌঁছানোর পর বুঝতে পারি গাড়িভাড়া চাওয়া হচ্ছে চারগুণ বেশি। বাধ্য হয়ে দার্জিলিং মোড় থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় গাড়িভাড়া করি। সকাল ৮টায় গাড়িতে উঠে দার্জিলিং পৌঁছাই সন্ধ্যায়। হোটেলের খোঁজ করতে গিয়ে দেখি এক রাতের জন্য ৫-৬ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে। শেষমেশ ম্যাল থেকে অনেক দূরে ৪ হাজার টাকায় একটি হোটেলে উঠি।’
তরুণের মতো ভাগ্য সদয় হয়নি অনেকেরই। চড়া ভাড়া দিয়ে হোটেলে রাত কাটানোর সামর্থ্য না থাকায় প্রচুর পর্যটক বেছে নেন দার্জিলিং স্টেশন চত্বর। রাতে কোনও টয়ট্রেন নেই। কিন্তু ওয়েটিং রুম ভিড়ে ঠাসা। প্ল্যাটফর্মগুলিতেও কার্যত তিলধারণের জায়গা নেই। পুরুষের ভিড়ে শিশু কোলে নিয়ে বসে রয়েছেন মহিলারা। বাইরে বৃষ্টি হলেও শৌচালয়ে জল নেই। ভিতর থেকে দরজা লাগানোর কোনও ব্যবস্থা নেই। এই ভিড়ে ছিলেন রাজস্থানের গিরিধারী লাল। তিনি বললেন, ‘টাকা দিয়েও শৌচাগার ব্যবহারের উপায় নেই। কোথাও ঘুরতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতা হয়নি।’ তাঁর পাশে বসে থাকা কমলেশ বললেন, ‘দার্জিলিং বেড়াতে এসে এমন অভিজ্ঞতা হবে আগাম জানতে পারলে আসতাম না।’ অনেক মহিলা জানালেন, শৌচালয়ের দরজা ভাঙা শুনে এবং জল না থাকায়, তাঁরা তেষ্টাতেও জলপান করছেন না। হোটেলের ভাড়া প্রসঙ্গে আগ্রার শৈলেন্দ্র সাক্সেনা বললেন, ‘যার থেকে যেমন পারা যায় লুটে নেওয়া হচ্ছে।’
এমন পরিস্থিতি যে কোনও জায়গার ইতিবাচক বিজ্ঞাপন হতে পারে না, তা স্বীকার করে নিয়ে হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক সম্রাট সান্যাল বলছেন, ‘এমন বিশৃঙ্খল অবস্থার পরিবর্তনে প্রশাসনিক নজরদারি অত্যন্ত প্রয়োজন। সুয়োমোটোয় ব্যবস্থা নেওয়াও উচিত। পর্যটনের স্বার্থে টোল ফ্রি নম্বর চালু করা সময়ের দাবি। পাশাপাশি এই শিল্পের সঙ্গে আমরা যারা যুক্ত, তাদের নিজের এবং এলাকার ভবিষ্যৎ স্বার্থে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।’ পরিস্থিতিতে যথেষ্ট বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষ বলেন, ‘অতিথিদের এই হেনস্তা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। অসাধু চক্র উপড়ে ফেলা হবে। তার জন্য যা যা করার আমরা করব। ইতিমধ্যে বিষয়টি জেলা শাসককে জানানোর পাশাপাশি উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।’
