পঙ্কজ মহন্ত, বালুরঘাট: ‘ওঁ জবাকুসুম সঙ্কাশং…’— মন্ত্র তো অনেকেই পড়েন, কিন্তু সেই উচ্চারণের গভীরে লুকিয়ে থাকা সুর আর ছন্দের শুদ্ধতা সবার মুখে বজায় থাকে কতটা? শাস্ত্র বলে, ভুল উচ্চারণের একটি অক্ষরও বদলে দিতে পারে মন্ত্রের সম্পূর্ণ অর্থ। আর সেই ‘শব্দ-বিভ্রাট’ আশীর্বাদের বদলে নাকি ডেকে আনতে পারে অমঙ্গল। নতুন প্রজন্মের পুরোহিতদের মধ্যে এই ত্রুটি ঘোচাতে এবং সনাতনী রীতিনীতিকে বজায় রাখতে বছরের প্রথম দিনে বালুরঘাটে অভিনব উদ্যোগ নিল দক্ষিণ দিনাজপুর (Dakshin Dinajpur) পুরোহিত কল্যাণ সমিতি। রঘুনাথপুর মন্দির চত্বরে যাত্রা শুরু করল বিশেষ সংস্কৃত অ্যাকাডেমি ও পাঠশালা।
রঘুনাথপুর মন্দিরের শান্ত পরিবেশে একটি ছোট্ট ঘর। দরজার কপাটে খোদাই করা প্রাচীন ঋষিবাক্য— ‘সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে’। অর্থাৎ সেই বিদ্যাই প্রকৃত বিদ্যা, যা মানুষকে অজ্ঞানতা থেকে মুক্তি দেয়। ঘরের ভেতরটা বদলে গিয়েছে এক আধুনিক চতুষ্পাঠীতে। দেওয়ালে হোয়াইট বোর্ড, সারি সারি সাজানো চেয়ার-টেবিল। সেখানে প্রবীণ পুরোহিত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত অধ্যাপকদের সামনে ছাত্রের মতো বসে আছেন তরুণ যাজকরা। লক্ষ্য একটাই, কেবল জীবিকা নয়, শুদ্ধ আধ্যাত্মিক সাধনায় নিজেদের ও যজমানদের মঙ্গলসাধন।
এদিন পাঠশালায় উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সংস্কৃত অধ্যাপক ডঃ কুন্তল গঙ্গোপাধ্যায়। অধ্যাপক বলেন, ‘মহাভাষ্য ও সিদ্ধান্ত কৌমুদী ঘাঁটলে দেখা যায়, দেবতা ও অসুরদের যুদ্ধে অসুররা পরাজিত হয়েছিল শুধুমাত্র ভুল মন্ত্র উচ্চারণের কারণে। ভুল উচ্চারণে মন্ত্র তার প্রাণ হারায়।’ এই পাঠশালায় তাই কেবল মন্ত্র মুখস্থ করানো নয়, বরং ব্যাকরণের চুলচেরা বিশ্লেষণে উদাত্ত, অনুদাত্ত ও স্বরিত— এই তিন প্রকার স্বরের প্রয়োগ শেখানো হবে।
সংগঠনের জেলা সম্পাদক প্রদীপ ভাদুড়ির চোখে এক বড় স্বপ্ন। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না কোনও পুরোহিত কেবল পুজো সারার তাড়নায় ভুল মন্ত্র পাঠ করুন। নবাগতদের উচিত আগে পদ্ধতি শেখা, তারপর পুজো করা।’ পাঠশালায় অংশ নেওয়ার পর নবীন পুরোহিত রাহুল চক্রবর্তীর কথায় ধরা পড়ল তৃপ্তির সুর, ‘সঠিকভাবে উচ্চারণ শিখলে নিজের ভেতরের বৌদ্ধিক বিকাশ তো হবেই, যজমানদেরও পূর্ণ ফল দিতে পারব। এই পাঠশালা আমাদের জন্য ভীষণ জরুরি ছিল।’
