শিবশংকর সূত্রধর, কোচবিহার: সমাবর্তন অনুষ্ঠানের নামে ডাক্তারি পড়ুয়াদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা তুলে চম্পট দেওয়ার অভিযোগ উঠল কোচবিহার এমজেএন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাত্র নেতার বিরুদ্ধে। রবিবার ঘটা করে সমাবর্তন হওয়ার কথা থাকলেও, অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে পড়ুয়া ও অভিভাবকরা দেখলেন সব ফাঁকা, নেই কোনও আয়োজন। এই ঘটনায় সোমবার দিনভর উত্তপ্ত থাকল মেডিকেল চত্বর। আরজি কর কাণ্ডের আবহে যে ‘থ্রেট কালচার’ নিয়ে উত্তাল হয়েছিল রাজ্য, সেই বিতর্কে নাম জড়ানো ছাত্র নেতা সুস্মিত রায়ের বিরুদ্ধেই ফের অভিযোগের তির ওঠায় তুঙ্গে রাজনৈতিক চাপানউতোর।
২০২০ সালের এমবিবিএস ব্যাচের পড়ুয়াদের সমাবর্তন অনুষ্ঠান ঘিরে কয়েকমাস ধরেই তোড়জোড় চলছিল। অভিযোগ, ছাত্র নেতা সুস্মিত রায়, আয়ুষ সিং চৌহান, অনন্যা শীল ও বুদ্ধদেব দে সহ একটি গোষ্ঠী অনুষ্ঠানের সমস্ত দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। মাথাপিছু ৬ হাজার টাকা করে ৯৪ জন পড়ুয়ার থেকে কয়েক লক্ষ টাকা তোলা হয়েছিল। রবিবার ছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দূরদূরান্ত থেকে অভিভাবকরাও এসে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু অডিটোরিয়ামে পৌঁছে তাঁদের চক্ষু চড়কগাছ। কোথাও কোনও মঞ্চসজ্জা নেই, নেই শংসাপত্র বা স্মারকের চিহ্ন। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত ছাত্র নেতাদের আর হদিস মিলছে না।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডাঃ সৈকত দত্ত বলেন, ‘আমরা ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
এদিন সকালে অধ্যক্ষের ঘরের সামনে ভিড় জমান প্রতারিত পড়ুয়ারা। তাঁদের দাবি, আরজি কর কাণ্ডের পর উত্তরবঙ্গের যে ‘মেডিকেল লবি’ ও থ্রেট কালচার নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল, সেই সুস্মিত রায় ছিলেন সেই লবির অন্যতম মুখ। তার পরেও কলেজ কর্তৃপক্ষ কেন সমাবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের দায়িত্ব তাঁদের হাতে ছেড়ে দিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অভিভাবকরা। নদিয়া থেকে আসা অভিভাবক এমএ রাজ্জাক ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘ছেলের জীবনের একটা বড় দিন দেখতে এসেছিলাম। ৬ হাজার টাকা জমা দিয়েও যদি এমন জোচ্চুরি সহ্য করতে হয়, তবে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? ছেলেটা আমার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।’
আরেক অভিভাবক আশিস মুখোপাধ্যায়ের গলায় শোনা গেল তদন্তের দাবি। তিনি বলেন, ‘শুনলাম সুস্মিত রায়দের নিয়ে একটি কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল নিজস্ব তত্ত্বাবধানে কাজটা করা। ছাত্রদের হাতে এত টাকা তুলে দেওয়ার মাশুল দিতে হচ্ছে আমাদের। আমরা আইনি লড়াইয়ে যাব।’
এদিন মেডিকেলের অডিটোরিয়ামে গিয়ে দেখা গেল, দেওয়ালে কেবল সমাবর্তনের একটি পোস্টার ঝুলছে। কিন্তু ভিতরের দৃশ্য হাহাকার করছে। ছাত্রছাত্রীরা জানান, সুস্মিতকে ডাকা হলে তিনি একেকবার একেক অজুহাত দিতে থাকেন এবং একসময় গা-ঢাকা দেন। এমনকি কমিটির তালিকায় নাম থাকা অন্য পড়ুয়ারাও যে এই দুর্নীতির বিষয়ে অন্ধকারে ছিলেন, তাও স্পষ্ট হয়েছে। সুপর্ণ মুখোপাধ্যায় নামে এক পড়ুয়া বলেন, ‘কমিটিতে আমার নাম রাখা হয়েছে অথচ আমি কিছুই জানি না। সমাবর্তনের সকালে দেখি কিছুই কেনা হয়নি। সুস্মিত এখন পলাতক। আমরা এর শেষ দেখে ছাড়ব।’
পড়ুয়া রেজা এমডি ফারদিন বলেন, ‘সমাবর্তন আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো। সেই স্বপ্ন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হল। আমরা এখন বিচারের আশায় অধ্যক্ষের দ্বারস্থ হয়েছি।’ বারবার অভিযুক্ত ছাত্র নেতা সুস্মিত রায়কে ফোন করা হলেও তিনি ফোন না তোলায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মেডিকেলের অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, পুরোনো লবি এখনও সক্রিয় কোচবিহারে। থ্রেট কালচারের অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে উঠেছিল, তাঁরাই এখন আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ায় রীতিমতো অস্বস্তিতে মেডিকেল প্রশাসন। অভিভাবকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, অবিলম্বে টাকা ফেরত না পেলে বা সমাবর্তনের ব্যবস্থা না হলে তাঁরা বড়সড়ো আইনি পদক্ষেপের পথে হাঁটবেন।
