শিবশংকর সূত্রধর, কোচবিহার: বড়সড়ো কোনও চুরির কথা বোঝাতে আমরা বলি পুকুর চুরি। এটাই প্রচলিত বাগধারা। কিন্তু কোচবিহার (Cooch Behar) জেলায় এলে দেখা যাবে, কেবল পুকুর চুরি নয়, নদীও চুরি হয়। কীভাবে? মরাতোর্ষা (Moratorsha) নদী ও তার চর এলাকা দখল করে যেভাবে একের পর এক বাড়িঘর তৈরি হচ্ছে, কংক্রিটের ঘর বানিয়ে ব্যবসায়িক কাজে লাগানো হচ্ছে, তাতে নদীর অস্তিত্ব সংকটে। এ যেন দখল নয়, ধীরে ধীরে চুরিই হয়ে যাচ্ছে মরাতোর্ষা।
আর এই দখলদারির পিছনে রয়েছে প্রভাবশালীদের হাত আর রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার। তোর্ষার এই শাখানদীর একসময় জলধারণের ক্ষমতা অনেক বেশি ছিল। কিন্তু নাব্যতা কমতে কমতে বহু জায়গাতেই মরাতোর্ষা কার্যত মাঠে পরিণত হয়েছে। এই নদীকে যদি ঠিক রাখা যেত তাহলে তোর্ষার অনেক জল এই নদী ধারণ করতে পারত। ফলে তোর্ষার ভয়াল পরিস্থিতিজনিত বিপদ কিছুটা হলেও কমানো যেত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রশাসনের নাকের ডগায় নদী দখল হয়ে গেলেও কার্যত কোনও ব্যবস্থাই নিতে দেখা যায়নি প্রশাসনকে। সেচ দপ্তরের এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার জয়প্রকাশ পান্ডে আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ‘বিষয়গুলি খতিয়ে দেখে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কিন্তু কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কবেই বা নেওয়া হবে, তার সদুত্তর মেলেনি।
কোচবিহার শহর ও সংলগ্ন এলাকায় তোর্ষার দুটি শাখানদী রয়েছে। একটি খাগড়াবাড়ি, টাকাগাছ, দর্জিপাড়া হয়ে তোর্ষায় মিশেছে। এটি প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ। বড় শাখানদীটি আলিপুরদুয়ার জেলার সোনাপুরের দিক থেকে কোচবিহারে ঢুকেছে। সেটি পুণ্ডিবাড়ি, ডোডেয়ারহাট, বালাপাড়া, শালবাগান, পিলখানা, সাহেব কলোনি হয়ে মূল তোর্ষায় মিশেছে। এটি প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ। দুটি নদীই ‘মরাতোর্ষা’ নামে পরিচিত। বর্ষার সময় তিন-চার মাস সময় বাদ দিলে বছরের বাকি সময়গুলিতে এই নদীতে জল প্রায় থাকে না বললেই চলে। কচুরিপানা, আগাছা, গাছগাছালিতে ভর্তি থাকায় নদীর নাব্যতা অনেক কম। জল না থাকা বা একেবারেই কম থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চর দখলের বাড়বাড়ন্ত দেখা যায়।
খাগড়াবাড়ি থেকে দর্জিপাড়া এলাকা পর্যন্ত কিছু এলাকায় দখল করে বাড়ি তৈরির অভিযোগ উঠেছে। আবার গুড়িয়াহাটি-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের ভারত কলোনির দিকেও একই ছবি দেখা গিয়েছে। পার্শ্ববর্তী পিলখানা এলাকায় চরের দিকে নতুন করে কিছু বাড়িঘর তৈরি হয়েছে। মরাতোর্ষার ধারে একাধিক বাজার থাকায় সেখানকার আবর্জনা নিয়মিত নদীতে জমা হচ্ছে। ফলে নাব্যতা কমছে। সম্প্রতি তোর্ষা নদী যেভাবে তার আগ্রাসী চেহারা দেখিয়েছে তাতে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন কোচবিহার শহর। তোর্ষার বাঁধের ক্ষতি হলে সেই জল শহর ভাসিয়ে দিতে পারে। আবার শহর রক্ষাকারী বাঁধের অনেকটা অংশ মরা তোর্ষা নদীর পাশ দিয়ে রয়েছে। সেই দিকটায় জলের তোড় সেভাবে দেখা যায় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মরাতোর্ষা নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি পেলে ও সেখান থেকে দখলদারি সরানো গেলে মূল তোর্ষার ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমবে। নদীবিশেষজ্ঞ তথা নেচার অ্যান্ড স্টাডি গ্রুপের সম্পাদক অরূপ গুহের কথা, ‘প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে নদী দখল করলে তার কুপ্রভাব পরিবেশের ওপর পড়বেই। এবিষয়ে সাধারণ মানুষকে যেমন সচেতন হতে হবে। তেমনই প্রশাসনিক তৎপরতা নিতে হবে।’
