কোচবিহার: ‘পুড়িয়েই মারা হয়েছে আমাদের বাড়ির মেয়েকে।’ পুলিশের কাছে এমনটাই অভিযোগ করলেন মৃত নার্সিং কর্মীর পরিবারের লোকজন। বৃহস্পতিবার মৃতা ছন্দা রায়ের (৩৫) দুই দাদা বাগডোগরা থেকে কোচবিহারে এসে পৌঁছান। এদিন দুপুরে এমজেএন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ছন্দার ময়নাতদন্ত করা হয়। পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোর পর তাঁরা বোনের মৃতদেহ নিয়ে বিকেলে বাগডোগরার উদ্দেশে রওনা হন।
ছন্দার দাদা চন্দন রায় জানান, মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাঁর বোন রঞ্জিত রায়কে ভালোবেসে বিয়ে করেন। প্রথমে এই বিয়ে মেনে না নিলেও মায়ের কান্নাকাটিতে তাঁরা পরবর্তীতে মেনে নেন। ইটাহারের শ্বশুরবাড়িতে থেকেই পরবর্তীতে বোন পড়াশোনা করেন এবং নার্সিং ট্রেনিং নিয়ে সরকারি চাকরি পান। বোন এবং ভগ্নীপতির মধ্যে প্রায়শই বিভিন্ন কারণে মতবিরোধ লেগেই থাকত। শুধু তাই নয়, বোনকে মারধর করার অভিযোগও করেন তিনি। চন্দন বলেন, ‘রঞ্জিতের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বোন ঠিক করেছিল তাকে ডিভোর্স দেবে। কিন্তু তার আগেই ওর স্বামী এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটাবে আমরা ভাবতে পারিনি। আমাদের একমাত্র বোন চলে গেল। ভাগ্নিটার এখন আমরা দুই মামাই ভরসা।’ তাঁর কাছ থেকে জানা গেল, ছন্দার মেয়েকে এদিন কালিম্পংয়ের বোর্ডিং স্কুল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। মায়ের মৃত্যুসংবাদ শোনার পর অসম্ভব ভেঙে পড়েছে এই ছাত্রী। ছন্দার বাপের বাড়ির লোকজন এখন রঞ্জিতের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাইছেন।
হাসপাতাল চত্বরে ছন্দার মরদেহে শ্রদ্ধা জানান হাসপাতালের এমএসভিপি সৌরদীপ রায়, নার্সিং সুপারিন্টেন্ডেন্ট শেফালি পুরকায়স্থ সহ সকল নার্সিং স্টাফ। শুক্রবার তাঁর উদ্দেশে হাসপাতালের হলঘরে একটি শোকসভা করা হবে বলে জানা গিয়েছে। ডাঃ সৌরদীপ রায় জানান, এই ধরনের ঘটনা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। পুলিশ তদন্ত শুরু করছে। যে দোষী সে যেন উপযুক্ত শাস্তি পায়। হাসপাতালের ডেপুটি নার্সিং সুপারিন্টেন্ডেন্ট পিয়ালী কুণ্ডু সরকার বলেন, ‘এই নিষ্ঠুর হত্যা মেনে নেওয়া যায় না। এভাবে ওঁর স্বামীর আইন হাতে তুলে নেওয়া ঠিক হয়নি। সকল নার্সিং স্টাফের পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি রাখছি।’
শুধু বাড়ির লোক নন, এদিন মৃতার প্রতিবেশীরাও মানসিকভাবে যথেষ্ট বিধ্বস্ত। অনেকেই ভুলতে পারছেন না ছন্দার জ্বলতে থাকা ওই চেহারা। ছন্দার স্বামী যেহেতু ড্রাইভার ছিল তাই পেট্রোল বা ডিজেল দিয়েই তাঁকে পোড়ানো হয়েছে, এই কথাই উঠে আসছে সকলের অনুমানে। বাড়িওয়ালা দেবজিৎ বর্মা বলেন, ‘ওঁদের দাম্পত্য সম্পর্ক ভালো ছিল না। ওঁর বর মাঝেমধ্যেই এসে মারধর করতেন। এই নিয়ে অভিযোগ জানাতে একদিন আমার সঙ্গে ছন্দা কোচবিহার সদর মহিলা থানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে আর এফআইআর করেননি। ’ ছন্দার মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তাঁর সহকর্মীরা। তাঁদের কাছেই জানা গেল, যথেষ্ট মিশুকে, হাসিখুশি এবং যথেষ্ট কাজের মেয়ে ছিলেন তাঁদের প্রিয় সহকর্মী। দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা তিনি তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। তবে শুধু পাড়ার লোক নয়, এই মৃত্যু সোশ্যাল মিডিয়াতেও যথেষ্ট আলোড়ন ফেলেছে। প্রত্যেকেই দোষীর কঠোরতম শাস্তি চাইছেন। সেইসঙ্গে উঠে আসছে শহরের আইনশৃঙ্খলার কথাও। এই ঘটনা সম্পর্কে কোচবিহারের পুলিশ সুপার সন্দীপ কাররা জানিয়েছেন, নার্সিং স্টাফের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বাড়ির লোকের পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। মূল অভিযুক্ত বর্তমানে আংশিক দগ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন। সে সুস্থ হয়ে উঠলে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
