কোচবিহার ব্যুরো: শব্দবাজি নিয়ন্ত্রণে অনেক কথাই বলা হয়েছিল। কিন্তু নিট ফল শূন্য। কালীপুজোর আগে থেকেই কোচবিহারজুড়ে দেদারে শব্দবাজির দাপট দেখা গেল। শব্দবাজি নিয়ন্ত্রণের কথা মাথায় রেখে শহরগুলিতে পৃথক বাজিমেলার আয়োজন করা হয়েছে। পুলিশও নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে বলে তাদের দাবি। তবুও কী করে এত শব্দবাজি শহরে ঢুকল বলে সচেতন নাগরিকরা প্রশ্ন তুলেছেন।
পরিবেশপ্রেমী সংগঠন নেচার অ্যান্ড স্টাডি গ্রুপের সম্পাদক অরূপ গুহর বক্তব্য, ‘আমরা প্রতিবারই আশা করি, এবার হয়তো শব্দবাজির উপদ্রব থাকবে না। কিন্তু শেষপর্যন্ত তা আর হয় না। ইতিমধ্যেই যেভাবে শব্দবাজি ফাটা শুরু হয়েছে তাতে রীতিমতো চিন্তা হচ্ছে। পরিবেশ তো বটেই বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের ওপর এর মারাত্মক কুপ্রভাব পড়বে। পুলিশের আরও বেশি নজরদারি প্রয়োজন।’ জেলা পুলিশের এক আধিকারিকের অবশ্য বক্তব্য, ‘আমরা প্রতিটি থানা এলাকাতেই অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণে শব্দবাজি বাজেয়াপ্ত করেছি। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর কম পরিমাণে শব্দবাজি ফেটেছে।’
তবে পুলিশ যাই দাবি করুক না কেন বাস্তবের ছবিটা অন্য। কালীপুজোর দু’দিন আগে থেকেই কোচবিহারের বহু জায়গাতেই দেদার শব্দবাজি ফাটতে শোনা গিয়েছে। রবিবার সন্ধের পর থেকেই সময় যতই গড়িয়েছে শব্দবাজির দাপট ততই বেড়েছে। সূত্রের খবর, দক্ষিণবঙ্গ থেকে শিলিগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার হয়ে প্রচুর পরিমাণ নিষিদ্ধ শব্দবাজি কোচবিহারে ঢুকেছে। নিষিদ্ধ শব্দবাজির ক্ষেত্রে আলিপুরদুয়ার অন্যতম ঘাঁটি। কালীপুজোর সময় পুলিশের নজরদারি বেশি হওয়ায় অন্তত চার-পাঁচ মাস আগেই দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে শিলিগুড়ি হয়ে আলিপুরদুয়ারে নিষিদ্ধ শব্দবাজি মজুত করা হয়। তা ধাপে ধাপে কোচবিহারের দেওয়ানহাট, বলরামপুর, নাজিরহাট, বাণেশ্বর সহ বেশ কিছু এলাকার অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে সেই শব্দবাজি অন্যান্য ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছায়।
জেলার নানা প্রান্তের মতো মাথাভাঙ্গা–২ ব্লকের ঘোকসাডাঙ্গা, পারডুবি, উনিশবিশা সহ ব্লকের বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ শব্দবাজির দাপট লক্ষ করা গিয়েছে। প্রচুর পরিবেশবান্ধব বাজি কিনেছেন বলে নিরঞ্জন দাস, অজয় সরকার, সঞ্জিত রায় প্রমুখ জানালেও নিষিদ্ধ শব্দবাজি কেনার দিকেই অনেকের ঝোঁকটা বেশি। এক্ষেত্রেও প্রশাসনের বিরুদ্ধে উদাসীনতার অভিযোগ উঠেছে। মাথাভাঙ্গার এসডিপিও সমরেণ হালদার অবশ্য বলেন, ‘নিষিদ্ধ শব্দবাজির দাপট রুখতে আমাদের অভিযান জারি রয়েছে।’ অন্যদিকে, দিনহাটা থানা ও সাহেবগঞ্জ থানার পুলিশের বিশেষ অভিযানে প্রায় চার লক্ষাধিক টাকার নিষিদ্ধ শব্দবাজি উদ্ধার হল। এনিয়ে দিনহাটার এসডিপিও ধীমান মিত্র, দিনহাটা থানার আইসি জয়দীপ মোদক রবিবার দিনহাটা থানায় একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন। এসডিপিও বলেন, ‘গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সাহেবগঞ্জ রোডের একটি পরিত্যক্ত গোডাউনে অভিযানে বিপুল পরিমাণে নিষিদ্ধ শব্দবাজি উদ্ধার হয়েছে। পাশাপাশি, সাহেবগঞ্জ, নাজিরহাট সহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে এরকম আরও শব্দবাজি মিলেছে।’
বাজি বিক্রেতারা কেন কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছেন না? সারা বাংলা আতশবাজি উন্নয়ন সমিতির কোচবিহারের সভাপতি সুকুমার দে’র বক্তব্য, ‘আমরা যাঁরা লাইসেন্সধারী আতশবাজি ব্যবসায়ী রয়েছি তাঁরা কেউই নিষিদ্ধ শব্দবাজি বিক্রি করি না। তবে এটা ঠিক কিছু অসাধু মানুষ আগে থেকে শব্দবাজি মজুত করে রাখে ও সেগুলি বিক্রি করে। আমাদের কাছে এরকম কোনও খবর এলে আমরা তা প্রশাসনকে জানাচ্ছি, পুলিশ-প্রশাসনও তাদের মতো করে ব্যবস্থা নিচ্ছে।’ দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে বিপদ বাড়বে বলে ইএনটি বিশেষজ্ঞ তথা এমজেএন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এমএসভিপি সৌরদীপ রায়ের সতর্কবাণী, ‘শব্দবাজি কান এবং হৃদযন্ত্রের পক্ষে খারাপ। তাই নিষিদ্ধ শব্দবাজি ব্যবহার করা কোনওমতেই উচিত নয়।’
