বাবাই দাস ও সায়নদীপ ভট্টাচার্য, তুফানগঞ্জ: ভাবুন তো, এমন এক বাড়ি যেখানে দেওয়ালগুলো নিজেরাই বাতাস থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড শুষে নেবে! শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, কোচবিহারের (Cooch Behar) তুফানগঞ্জের (Tufanganj) এক তরুণ গবেষক সেই ‘কল্পনাকেই’ বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। তাঁর নাম ডঃ মানস সরকার। লস অ্যাঞ্জেলেসের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার সিভিল ও এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে যুগান্তকারী কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণকারী কংক্রিট আবিষ্কার করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্মাণসামগ্রী প্রস্তুতকারক শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক সংস্থা জেএইচবিপি ইনকর্পোরেশন-এর ক্যালিফোর্নিয়া শাখায় গবেষক-বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত। তিনি এমন এক ধরনের ফাইবারভিত্তিক সিমেন্ট তৈরি করেছেন যা সাধারণ কংক্রিটের তুলনায় বহুগুণ বেশি পরিবেশবান্ধব। রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এই সিমেন্ট নিজেই বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে তাকে স্থায়ী যৌগে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এই আবিষ্কার অদূরভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে বিজ্ঞান মহল।
সোমবার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে মানস বলেন, ‘আমরা চাই, আগামীদিনে প্রতিটি বিল্ডিং শুধু বাসযোগ্যই নয়, পরিবেশেরও বন্ধু হোক। তাই আমাদের লক্ষ্য এমন কিছু উদ্ভাবন করা যা পৃথিবীর জন্য উপকারী হবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতের নির্মাণ হবে টেকসই ও বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ। তবে শক্তি আর স্থায়িত্বের সঙ্গে পরিবেশ-দায়বদ্ধতাকে একসঙ্গে মেলতে পারলেই ভবিষ্যতের নির্মাণ সঠিক পথে এগোবে। আমাদের গবেষণা সেই সমাধানই খুঁজছে।’ তুফানগঞ্জ শহরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের নেতাজিনগর এলাকার বাসিন্দা মানস। তাঁর বাবা ছিলেন জীববিদ্যার শিক্ষক। ছোটবেলায় বাবার অনুপ্রেরণাতেই বিজ্ঞানের প্রতি ঝোঁক তাঁর। তুফানগঞ্জ নৃপেন্দ্রনারায়ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক হন তিনি। সেখানেই বায়োফিজিক্সে স্নাতকোত্তর করেন। পরবর্তীতে সেখান থেকেই পিএইচডি করার সময় কংক্রিটকে কেন্দ্র করে তাঁর গবেষণার পথ চলা শুরু। তখন তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ব্যাকটিরিয়ার সাহায্যে কংক্রিটের ফাটল স্বয়ংক্রিয়ভাবে সারানো। সেই কাজই তাঁকে আন্তর্জাতিক গবেষণার দুনিয়ায় পরিচিতি এনে দেয়। এরপর চিনের ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যানো-মেটিরিয়াল ব্যবহার করে কংক্রিটের স্থায়িত্ব বৃদ্ধির কাজে যুক্ত হন। ডেনমার্কের আরহাস বিশ্ববিদ্যালয় ও আইআইটি মাদ্রাজেও গবেষণা করেছেন তিনি। যুগান্তকারী আবিষ্কার প্রসঙ্গে মানস বলছেন, ‘বিশ্বের মোট কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমনের প্রায় ৮ শতাংশই আসে সিমেন্ট শিল্প থেকে। যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। এই চেষ্টা সিমেন্ট-কংক্রিট ব্যবহারে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে, যা শিল্পে সামগ্রিক কার্বনের প্রভাব কমাতে সহায়তা করবে।’ প্রতিবছর কংক্রিট নির্মাণের ফলে কয়েক লক্ষ টন কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়। সেদিক থেকে এই নতুন প্রযুক্তি ভবিষ্যতের জন্য এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। একদিকে যেমন এটি শক্তিশালী ও টেকসই, অন্যদিকে বায়ুমণ্ডলের ক্ষতিকর গ্যাসকে নিজের ভিতরে আটকে রেখে পরিবেশকে শুদ্ধ করবে, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইতিমধ্যেই ডঃ সরকারের কাজ প্রকাশিত হয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নালে। সম্প্রতি তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিশেষ স্বীকৃতি ‘আইনস্টাইন ভিসা’ অর্জন করেছেন। তাঁর এই উদ্ভাবন পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে এক নতুন দিশা খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। মানসের দাদা তাপস সরকারের কথায়, ‘ছোটবেলা থেকেই ওর শখ গবেষক হওয়ার। মেধা, পরিশ্রম এবং গবেষণার প্রতি নিষ্ঠা থাকলে অনায়াসেই যে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা যায়, ও নিজেই তার প্রমাণ।’ তুফানগঞ্জের এক ছোট শহর থেকে যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিজয়ের পথে হাঁটছেন মানস। জন্মভূমির মানুষ আজ গর্বিত, তাঁদের এক সন্তান পৃথিবীর উষ্ণায়নকে প্রতিরোধ করতে এগিয়ে চলেছেন বিজ্ঞানের আলো হাতে।
