প্রসেনজিৎ সাহা, দিনহাটা: রাস উৎসব। কোচবিহারের প্রাণের উৎসব। কোচবিহারে রাজ আমলে এই উৎসবের সূচনা হয়েছিল ভেটাগুড়িতে। কোচবিহারের (Cooch Behar) মহারাজা হরেন্দ্রনারায়ণ ভূপবাহাদুর প্রথম এই রাস উৎসবের সূচনা করেছিলেন। বুধবার রাসচক্র ঘুরিয়ে কোচবিহারের ঐতিহ্যবাহী রাসমেলার সূচনা হবে। কিন্তু ভেটাগুড়িতে রাস উৎসবের ছিটেফোঁটাও নেই। এই উৎসব ঘিরে যখন কোচবিহার শহরে সাজোসাজো রব, তখন ভেটাগুড়িতে নীরবতা। যা দেখে মন ভার ভেটাগুড়িবাসীর।
স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, ১৮১২ সালে রাসপূর্ণিমার (Ras Purnima) সন্ধ্যায় মহারাজা হরেন্দ্রনারায়ণ ভূপবাহাদুর মানসাই নদী পেরিয়ে নতুন রাজধানী ও রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেন। সেখানেই আরাধ্য দেবতা মদনমোহন ঠাকুরের পুজো দিয়ে রাস উৎসব ও মেলার সূচনা করেন। তবে ১৮২৭ সালে মহারাজা যখন রাজধানী স্থানান্তর করেন তখন কুলদেবতাকেও বেহারে (আজকের কোচবিহার) নিয়ে যান। বর্তমান ভেটাগুড়িতে রাস উৎসব ঘিরে আয়োজন নেই। রাসপূর্ণিমার দিনে শুধুমাত্র ভোগ নিবেদন ছাড়া কিছুই হয় না মহাকালধামের মন্দিরে। পুরোহিত সুজন বর্মনের কথায়, এখানে রাস উৎসবের সূচনার ব্যাপারে দাদুর কাছে শুনেছিলাম। এখন রাসপূর্ণিমা উপলক্ষ্যে মেলা হয় না। তবে নিয়ম মেনে রাসপূর্ণিমায় মন্দিরে ভোগ দেওয়া হয়।
ভেটাগুড়ি চৌপথি পেরিয়ে প্রায় দেড় কিমি যেতেই রাস্তার বা দিকে মহাকালধাম। সেই মন্দির ঘিরে জাকজমকের আয়োজন নেই। স্থানীয় বাসিন্দা সুনীল রায়ের কথায়, কোচবিহারের রাজার পুরোনো স্মৃতি বিজড়িত এই স্থানে রাসের উৎসবের আয়োজন হলে ভালো হত। নতুন প্রজন্ম অন্তত স্থানীয় ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারত। একই আক্ষেপ সুশীল বর্মনের, ভেটাগুড়িতে মেলা বলতে কালীমেলাই হয়। রাসেও মেলার আয়োজন করা উচিত।
গবেষক তথা প্রাবন্ধিক অভিজিৎ দাশের কথায়, বিভিন্ন গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী ১৮১২ সালে বেহার (আজকের কোচবিহার) থেকে রাজধানী ভেটাগুড়িতে নিয়ে আসেন। আর পদার্পণের দিনটা ছিল রাসপূর্ণিমা। সেদিন রাস উৎসব হয় বলেই বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী বর্ণনা রয়েছে। যদিও ১৮২২ সালে ধলুয়াবাড়িতে রাজধানী পরিবর্তন করে নিয়ে যান মহারাজা। এরপর ১৮২৭ সালে রাজধানী পুনরায় স্থানান্তরিত করে বেহারেই নিয়ে আসেন। এরপর সেখানে রাস উৎসব ধারাবাহিকভাবে হতে থাকে। তাঁর কথায়, ২০১২ সালে রাস উৎসবের ২০০ বছর পূর্তির সময় ভেটাগুড়ির নাগরিকদের একাংশ কোচবিহার পুরসভাকে আবদেন করেছিল, যাতে সেই উৎসবের একটি অংশের সূচনা ভেটাগুড়ি থেকেও করা হয়। কিন্তু আবেদন রাখা হয়নি। তাই প্রতিবছর রাস উৎসব এলে মনটা ভার হয়ে যায়।
অভিজিৎ বলেন, ৩০-৪০ বছর আগে খুটানিরবাজার এলাকায় দুই-তিন বছর রাস উৎসব হলেও পরে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে রাসের সূচনাস্থানেই উৎসব থেকে বঞ্চিত হওয়ায় যে কী আক্ষেপের, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
