কোচবিহার: দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে ধুঁকছে শহরের ম্যাগাজিন রোড সংলগ্ন সংস্কৃত কলেজ। জঙ্গল এবং আবর্জনায় কলেজ চত্বর প্রায় ঢেকে গিয়েছে। আবার নজরদারির অভাবে কলেজের মাঠ এখন যেন অলিখিত পার্কিং জোন। কলেজের দরজা-জানলার পরিস্থিতিও শোচনীয়। খসে পড়েছে ছাদের চাঙড়। নতুন বিজেপি সরকার তাদের সাম্প্রতিক বাজেটে সংস্কৃত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন এবং সংস্কৃত ভাষার প্রসারের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা ঘোষণা করেছে। তারপর থেকেই রাজ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজটি সংস্কার করে সেখানে পুনরায় পঠনপাঠন চালুর দাবি তুলছে শহরের বাসিন্দাদের একাংশ। কলেজটিকে নিয়ে আশার আলো দেখিয়েছেন খোদ বিধানসভার স্পিকার তথা কোচবিহার দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক রথীন্দ্র বসু। তাঁর কথায়, ‘কলেজটিকে আমি নজরে রেখেছি। দ্রুত সংস্কার করে পড়াশোনা শুরুর বিষয়ে পদক্ষেপ করতে আমি সংশ্লিষ্ট বিভাগের মন্ত্রীকে জানাব।’
একসময় বঙ্গীয় সংস্কৃত শিক্ষা পর্ষদের অধীনে কলকাতা, নবদ্বীপ, কাঁথি ও কোচবিহারে সংস্কৃত কলেজ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ১৯৫৪ সালের ১৮ মে নিজের হাতে সংস্কৃত কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন মহারাজ জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণ। প্রাচীন পুঁথি ও নানা গ্রন্থে কলেজের গ্রন্থাগার ছিল সমৃদ্ধ। সেসময় জেলার পাশাপাশি রাজ্যেও সংস্কৃতচর্চার অন্যতম পীঠস্থান হয়ে উঠেছিল এই কলেজটি। সংস্কৃত ভাষায় বেদান্ত, অলংকার, ব্যাকরণ, ন্যায় সহ বিভিন্ন বিষয়ে এখানে পড়াতে আসতেন নামকরা পণ্ডিতরা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হল রাধিকামোহন ভট্টাচার্য, জগবন্ধু পাঠক পঞ্চতীর্থ, তুষারকান্তি পঞ্চাধ্যায়ী প্রমুখ। প্রথমদিকে পঠনপাঠন চললেও ১৯৬৩ সালে জ্যোতিষ বিভাগের অধ্যাপক অবসরগ্রহণ করার পর একে একে বেশ কয়েকটি বিভাগ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে শুধু স্মৃতি ও কাব্য বিভাগ পড়ানো হত। ইতিহাস গবেষকদের থেকে জানা যায়, বিগত শতকের শেষ দিকে দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকতে থাকার পর কলেজটি একসময় বন্ধ হয়ে যায়।
কলেজের হতশ্রী দশায় ক্ষুব্ধ কলেজের ১৮৮৪ ব্যাচের প্রাক্তনী তথা দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ডের দ্বারপণ্ডিত অরুণাভ ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই সংস্কৃত ভাষার প্রসারের জন্য এই কলেজটি পুনরায় চালু করা হোক। সরকারি উদাসীনতায় কলেজটির এখন এই পরিস্থিতি। বর্তমান সরকারের কলেজটির দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।’ অভিযোগ, একসময় কলেজের গ্রন্থাগারটিতে প্রচুর বই এবং দুষ্প্রাপ্য পুঁথি ছিল। তার বেশিরভাগই চুরি হয়ে গিয়েছে। এপ্রসঙ্গে বিশ্ব রাজবংশী উন্নয়ন মঞ্চের মুখপাত্র বিপ্লব রায় বলেন, ‘কোচবিহারের ইতিহাস, সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই মহাবিদ্যালয়টি। বাজেটে যে প্রস্তাব হয়েছে, সেই অনুযায়ী এই কলেজটিকে সংস্কার করে পুনরায় চালু করতে অর্থ প্রদান করা হোক। আমরাও এবিষয়ে আশাবাদী।’
এনিয়ে কোচবিহার হেরিটেজ সোসাইটির সম্পাদক অরূপজ্যোতি মজুমদারের মতে, ‘সরকারি তৎপরতায় কলেজটি দ্রুত সংস্কার করে সেখানে কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের পঠনপাঠন চালু করা যেতে পারে। আমি আশাবাদী বর্তমান সরকার এবিষয়ে চিন্তাভাবনা করবে।’

