শিবশংকর সূত্রধর, কোচবিহার: রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের তরফে যত কড়া দাওয়াই কিংবা ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথাই ঢাকঢোল পিটিয়ে বলা হোক না কেন, বাস্তব পরিস্থিতির একচুলও বদল ঘটেনি। কোচবিহারজুড়ে (Cooch Behar) তোর্ষা ও মানসাই নদীর চরে প্রশাসনের নাকের ডগায় বুক ফুলিয়ে প্রকাশ্যে চলছে নিষিদ্ধ গাঁজা চাষ। মাঝেমধ্যে পুলিশের তরফে ‘লোকদেখানো’ কিছু অভিযান চালিয়ে খেতের ফসল নষ্ট করা হলেও, মূল কারবারি বা পান্ডাদের টিকিটিও কখনও ছোঁয়া যায় না। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরের প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নীরব মদত ছাড়া চরের বিস্তীর্ণ খাসজমিতে মাসের পর মাস এমন অবৈধ কারবার চালিয়ে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব বলে সরব বিরোধীরা। তাঁদের সরাসরি অভিযোগ, পুলিশি অভিযান কার্যত একটি সাজানো নাটক ছাড়া কিছুই নয়।
সূত্রের খবর, কোচবিহারের চান্দামারি, মাঘপালা, পুঁটিমারি-ফুলেশ্বরী থেকে শুরু করে গোসানিমারি পর্যন্ত মানসাই নদীর বুক চিরে বিঘার পর বিঘা জমিতে বেআইনিভাবে চলছে রমরমা গাঁজা চাষ। শুধু এখানেই নয়, মাথাভাঙ্গা-১ ব্লকের হাজরাহাট-১ কিংবা শীতলকুচির ভাঐরথানার দুর্গম চর অঞ্চলেও একই ছবি দেখা যাচ্ছে। নদীর চরগুলি মূলত খাসজমি হওয়ায় এই কারবারিদের সুবিধা অনেকটাই বেশি। নির্দিষ্ট কোনও জমির মালিকানা না থাকার ফলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে গাছ কাটলেও আইনি ফাঁকফোকর গলে সহজেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় কারবারিরা। সেখানে প্রকৃত চাষিরা কেবল দিনমজুরের মতো ব্যবহৃত হয়, অথচ সিংহভাগ মুনাফা চলে যায় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকা রাঘববোয়ালদের পকেটে।
স্থানীয় এক চাষির কথায়, ‘বর্ষার শুরুতে প্রথমে চারা তৈরি করা হয়। প্রায় দেড় মাস পরিচর্যার পর চরে রোপণ করা হয় গাছ। নভেম্বর মাস আসতেই তা কেটে বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে।’ কারবারিদের অন্দরের খবর, গত মরশুমের তুলনায় এবার এলাকাভেদে উৎপাদনের বহর সামান্য কম হলেও তার পেছনে পুলিশি তৎপরতার কোনও ভূমিকা নেই। মূলত স্থানীয় স্তরে কাটমানির ভাগবাঁটোয়ারা ও পাচারচক্রের মাথার রদবদল ঘটার কারণেই চাষের ক্ষেত্র কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। কাঁচা টাকার তীব্র লোভে পড়ে সাধারণ প্রান্তিক চাষিরা নিজেদের সর্বস্ব বাজি রেখে মাঠে নামলেও বিপদের মুখে পুলিশের কোপ পড়ে কেবল ফসলের ওপর, আড়ালে থেকে যায় মূল চক্রীরা।
অথচ জেলা পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিকের দাবি, ‘গাঁজা, আফিম সহ যাবতীয় মাদক কারবারের বিরুদ্ধে পুলিশ লাগাতার কড়া অভিযান চালাচ্ছে। সম্প্রতি বেশ কিছু এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রচুর গাঁজাখেত সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।’ যদিও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এইসব দাবি নিছকই ‘আইওয়াশ’। কারণ বড় মাপের কোনও গ্রেপ্তারি নেই। পুলিশ ও রাজনৈতিক মহলের একাংশের সঙ্গে কারবারিদের গোপন সখ্যর অভিযোগ ক্রমশই জোরালো হচ্ছে।

