শুভদীপ শর্মা, ময়নাগুড়ি: গরুমারা জঙ্গল (Gorumara) থেকে মাত্র এক-দুই কিলোমিটারের দূরত্বে অবস্থিত রামশাই গ্রাম পঞ্চায়েতের চোপড়ামারি গ্রাম (Chopramari Village)। ভোরের কুয়াশা কেটে গেলে গ্রামের উঠোনে ভেসে আসে ভারী পায়ের শব্দ। কিন্তু কেউ চমকে ওঠে না, কারণ এটাই এখানকার মানুষের কাছে স্বাভাবিক দৃশ্য। কখনও দাঁতাল হাতি, কখনও হরিণের দল, আবার কখনও গন্ডারের ধূসর ছায়া, বন থেকে নেমে আসে গ্রামের উঠোনে। চোপড়ামারিতে বন এবং গ্রামের মাঝে আলাদা সীমারেখা নেই। গ্রামের প্রান্তে বয়ে গিয়েছে জলঢাকা নদী। অপরপ্রান্তে রয়েছে ময়নাগুড়ি শহরের সঙ্গে সংযোগকারী রাজ্য সড়ক। গ্রামবাসী বিশ্বাস করেন, জঙ্গল আগে ছিল, মানুষ পরে এসেছে। তাই আতঙ্ক নয়, নীরব বোঝাপড়া ও সহাবস্থানই এখানে নিয়ম। স্থানীয় অনন্ত রায় বলেন, ‘কয়েক দশক আগে এখানে মানুষের বাস ছিল না। মানুষই বন্যপ্রাণীর জায়গা দখল করেছে। তাই ক্ষতিও মেনে নিতে হয়।’
ময়নাগুড়ি এবং নাগরাকাটা ব্লকের মাঝখানে বিস্তৃত গরুমারার জঙ্গল। নদী পার হয়ে গ্রামে নামছে হাতি, হরিণ বা গন্ডার। এই নিত্যদিনের অতিথিরা কখনও আবার ফসলের খেতেও ঢুকে ধান, আলু এবং অন্যান্য ফসলের ক্ষতি করে। কিন্তু এলাকাবাসীরা তা মেনে নেন। আরেক গ্রামবাসী মদন রায় বললেন, ‘ওরা আমাদের শত্রু নয়। জলঢাকা নদী পার হয়ে খাবার এবং শান্তি খুঁজতে আসে। আমরা যতটা শান্ত থাকি, ওরাও ততটাই শান্ত থাকে।’
গ্রামের মানুষদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং বোঝাপড়াই চোপড়ামারিতে থাকার ‘মন্ত্র’। সুবল বললেন, ‘ফসলের ক্ষতি হলেও আমরা বুনোদের গরুমারার অতিথি হিসেবে তাদের দেখছি। কারণ এখানে মানুষের আগমনের আগেই জঙ্গল ছিল, বন্যপ্রাণীরা এখানে তাদের অধিকার রাখে।’ দীর্ঘদিন ধরে বন্যপ্রাণীদের সঙ্গে সহাবস্থানে থেকে একটা জিনিস বুঝে গিয়েছেন তাঁরা। ভয় দেখালে হাতি কিংবা কোনও বন্যপ্রাণী বেশি উত্তেজিত হয়। তাই তাঁরা চুপচাপ দূরে থাকেন। এই মানসিকতা চোপড়ামারিকে বন্যপ্রাণীদের সঙ্গে মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের একটি উদাহরণ বানিয়েছে।
জলপাইগুড়ি বন বিভাগের বন আধিকারিক বিকাশ ভি বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন প্রান্তে যেখানে মানুষ-বন্যপ্রাণ সংঘাত আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে চোপড়ামারির মানুষ গোটা জেলাকে দিশা দেখাচ্ছেন। সহাবস্থান এবং সচেতন আচরণ যে সংঘাত কমাতে পারে, এই গ্রাম তার বাস্তব উদাহরণ। আমরা চাই, চোপড়ামারির মতো মানসিকতা গোটা জেলায় ছড়িয়ে পড়ুক। এতে মানুষ এবং বন্যপ্রাণ একে অপরের জন্য নিরাপদ থাকতে পারে।’
চোপড়ামারি গ্রামের এই নীরব বোঝাপড়া প্রমাণ করে, আতঙ্ক নয়, অভিজ্ঞতা, বোঝাপড়া ও সহিষ্ণুতাই মানুষ ও বন্যপ্রাণের মধ্যে শান্তিস্থাপন করতে পারে। বছরের পর বছর ধরে গ্রামের জীবনশৈলী দেখাচ্ছে, বন ও মানুষ একসঙ্গে থাকতে পারে, যদি বোঝাপড়া, সতর্কতা এবং সহিষ্ণুতা থাকে।
