মুরতুজ আলম, সামসী: মহানন্দা (Mahananda) নদীর দুই তীরের মাঝের ভবানীপুর (Bhabanipur) গ্রাম যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। চাঁচল (Chanchal)-১ নম্বর ব্লকের খরবা গ্রাম পঞ্চায়েতের এই গ্রামে প্রায় দুই হাজার মানুষের বসবাস। কিন্তু বছরের ১২ মাসই যোগাযোগের চরম সংকটে দিন কাটাতে হচ্ছে তাঁদের। বর্ষায় ভরা নদী পারাপারে নৌকাডুবির আশঙ্কা এবং শুখা মরশুমে বাঁশের নড়বড়ে মাচা ভাঙার ভয়, দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই প্রতিনিয়ত স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও হাটেবাজারে যাতায়াত করতে হয় গ্রামবাসীদের। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে দীর্ঘকাল ধরে কার্যত দ্বীপবন্দি হয়েই রয়ে গিয়েছেন এই এলাকার বাসিন্দারা।
ভৌগোলিক অবস্থানে ভবানীপুরের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে মরা মহানন্দা এবং দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে মূল মহানন্দা নদী। ফলে গ্রামটি একটি বদ্বীপের রূপ নিয়েছে। বর্ষার সময় জল বাড়লে একমাত্র ডিঙি নৌকাই যাতায়াতের ভরসা হয়ে ওঠে। সে সময় স্কুল পড়ুয়া, শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ রোগীদের নদী পারাপারের সময় আতঙ্কে থাকেন পরিবারের সদস্যরা। আবার শুখা মরশুমে নদীর বুকে বাঁশের অস্থায়ী মাচা তৈরি করে ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয়। গ্রামের বাসিন্দা তথা পঞ্চায়েত সদস্য গোলাম মোর্তুজা বলছেন, রাতে হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে অ্যাম্বুল্যান্সকে ১২ কিলোমিটার ঘুরপথে হাসপাতালে পৌঁছাতে হয়, যা জীবন-মৃত্যুর সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’
স্থানীয়দের আক্ষেপ, যুগের পর যুগ প্রতিশ্রুতি পেলেও মেলেনি পাকা সেতু। দোস্ত মহম্মদ ও ইয়াসিন আলির মতো প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, সেতু না থাকায় সময়মতো চিকিৎসা মেলে না, আবার কৃষকরাও উৎপাদিত ফসল বাজারে নিয়ে গিয়ে ন্যায্য দাম পান না। সাইফুল হকের আক্ষেপ, ‘জীবনের অনেকটা সময় নদী পার হয়েই কেটে গেল। তবে আজও পাকা সেতু দেখার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।’
এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধানে সরব হয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। চাঁচল-১ নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য রেশমা পারভিনের বক্তব্য, সেতু নির্মিত হলে এলাকার শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষিক্ষেত্রে নতুন প্রাণ সঞ্চার হবে। মালদা জেলা পরিষদের সহকারী সভাধিপতি এটিএম রফিকুল হোসেন বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকার করে জানিয়েছেন, মহানন্দার ওপর সেতু নির্মাণের দাবি রাজ্য স্তরে তোলা হবে। ইতিমধ্যে চাঁচলের বিধায়ক প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় ভবানীপুরের মানুষের এই দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলছেন, ‘এলাকাবাসীর স্বার্থে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
ভবানীপুরবাসীর কাছে একটি পাকা সেতু শুধু যোগাযোগের পথ নয়, বরং নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান কবে হবে, এখন সেই অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে আছে গোটা গ্রাম।

